আব্দুল্লাহ আল মারুফ চট্টগ্রাম। দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে বিনা বেতনে অজপাড়াগাঁয়ের কোমলমতি শিশুদের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে যাচ্ছেন বাদ পড়া ৫ হাজার বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রায় ২০ হাজার শিক্ষক। উচ্চশিক্ষিত (অনার্স ও মাস্টার্স ডিগ্রিধারী) এসব শিক্ষকের জীবন আজ চরম অবহেলা, অনাহার ও বৈষম্যের এক করুণ আলেখ্যে পরিণত হয়েছে।শনিবার (২৯ আগস্ট) বাংলাদেশ বেসরকারি প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম মহাসচিব সাদ্দাম হোসেন রুহান মন্ডল গণমাধ্যমের কাছে এসব তথ্য নিশ্চিত করেন।ঐতিহাসিক উদ্যোগ: বাংলাদেশে সর্বপ্রথম বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রেজিস্ট্রেশন এবং শিক্ষকদের জন্য সরকারি বেতন-ভাতা চালুর যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। বাদ পড়া বিদ্যালয়গুলোর মধ্যে ৫৩৪টি বিদ্যালয় শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নামে প্রতিষ্ঠিত।প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আকুল আবেদন: ভুক্তভোগী শিক্ষকেরা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান (এমপি)-এর কাছে আকুল আবেদন জানিয়েছেন—এই ২০ হাজার শিক্ষকের চাকরি অবিলম্বে জাতীয়করণ করে তাদের পরিবার নিয়ে বেঁচে থাকার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য।দাপ্তরিক অগ্রগতি: অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদকালে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে গত ৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ তারিখে জাতীয়করণের নির্দেশনাসংক্রান্ত চিঠি জারি করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ১১টি জেলা ও ১১টি উপজেলায় সরজমিনে যাচাই-বাছাই সম্পন্ন করে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়।কনসালটেশন কমিটির অনুমোদন: মন্ত্রণালয় কর্তৃক গঠিত কনসালটেশন কমিটি ৫,০০০ বিদ্যালয় জাতীয়করণের লক্ষ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন দেয়, যেখানে উপদেষ্টা, সচিব ও উপসচিবসহ সংশ্লিষ্ট সকল কর্মকর্তা স্বাক্ষর করেন।স্বল্প ব্যয় ও বিপুল কর্মসংস্থান: প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, দেশের প্রতিটি জেলায় গড়ে ৭৯টি করে বিদ্যালয় এই জাতীয়করণের আওতায় আসবে। এই ২০ হাজার শিক্ষকের জন্য সরকারের বাৎসরিক ব্যয় হবে মাত্র ৪০ কোটি টাকা—যা বর্তমান সরকারের জন্য কোনো বড় আর্থিক বোঝা নয়, অথচ এর মাধ্যমে ২০ হাজার পরিবারে স্বচ্ছলতা ফিরে আসবে।শিক্ষার্থীদের বঞ্চনা: এসব বিদ্যালয়ে বর্তমানে অধ্যয়ন করছে প্রায় ৮ লক্ষাধিক কোমলমতি শিশু, যারা রাষ্ট্রীয় উপবৃত্তি ও মিড-ডে মিলের মতো মৌলিক সুবিধাগুলো থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত হচ্ছে।জীবিকার সংগ্রাম: প্রতি মাসে একটি সংসার চালাতে যেখানে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা প্রয়োজন, সেখানে শিক্ষকেরা টানা ১৩ বছর ধরে একটি টাকাও সরকারি অনুদান বা বেতন পাচ্ছেন না। বাধ্য হয়ে শিক্ষকতার পাশাপাশি অনেককে টিউশনি, অটো রিকশা চালানো কিংবা রাতে সিকিউরিটি গার্ডের মতো পেশায় যুক্ত হতে হচ্ছে।চিকিৎসা ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা: বিনা বেতনে চাকরি করতে করতে অনেক শিক্ষক ইতোমধ্যে অর্থাভাবে মৃত্যুবরণ করেছেন, অনেকে অবসরে চলে গেছেন। যাদের বয়স শেষ পর্যায়ে, তাদের নতুন করে অন্য কোথাও চাকরি পাওয়ারও কোনো সুযোগ নেই। অর্থাভাবে তারা অসুস্থ বাবা-মায়ের চিকিৎসা কিংবা নিজেদের সন্তানের পড়াশোনার খরচ চালাতে পারছেন না।শিক্ষকতা একটি অত্যন্ত মহান পেশা। প্রাথমিক শিক্ষার শক্ত ভিত গড়ে দেওয়া এই শিক্ষকদের বেতন-ভাতার দাবিতে আজ রাজপথে ধুলাবালির মাঝে পড়ে থাকতে হচ্ছে-যা অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। আমাদের আকুল আকুতি, অবিলম্বে এই ২০ হাজার শিক্ষকের চাকরি জাতীয়করণ করে সমাজে মর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার ব্যবস্থা করা হোক।