আব্দুল্লাহ আল মারুফ চট্টগ্রাম।। চট্টগ্রাম দক্ষিণ বনবিভাগের বিভিন্ন রেঞ্জে বন ধ্বংস, অবৈধ কাঠ পাচার এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নাম ভাঙিয়ে চাঁদাবাজির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। পুটিবিলা, চুনতি ও পদুয়া রেঞ্জের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে এই সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। এর ফলে একদিকে যেমন ধ্বংস হচ্ছে সংরক্ষিত বনাঞ্চল, অন্যদিকে হুমকিতে পড়ছে এ অঞ্চলের জীববৈচিত্র্য ও বন্যহাতির করিডর।
স্থানীয় সূত্রে অভিযোগ পাওয়া গেছে, পুটিবিলা ও এর পার্শ্ববর্তী বনাঞ্চল থেকে নির্বিচারে গাছ কেটে সড়কপথে কাঠ পাচার করা হচ্ছে। নির্দিষ্ট অঙ্কের মাসোহারা বা ‘টোকেন বাণিজ্য’-এর বিনিময়ে বন বিভাগের কিছু অসাধু সদস্য কাঠবোঝাই যানবাহন চলাচলের সুযোগ করে দিচ্ছেন। তবে ডলু বনবিট কর্মকর্তা ইমন বিল্লাহ এ ধরনের অভিযোগ অস্বীকার করে জানিয়েছেন, টাকা নিয়ে কাঠ পাচার করার কোনো সুযোগ নেই এবং সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে তাৎক্ষণিক আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
একইভাবে চুনতি ও পদুয়া বনাঞ্চলের পরিস্থিতিও অত্যন্ত উদ্বেগজনক। চুনতিতে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের গাছ কাটা এবং নিলামের নামে বনজ সম্পদ সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে, পদুয়া রেঞ্জে বনভূমি জবরদখল, ভুয়া বা জাল কাগজপত্রের মাধ্যমে কাঠ পরিবহন এবং বন মামলার ভয় দেখিয়ে সাধারণ মানুষকে হয়রানি ও অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।
বন রক্ষার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে মাঠপর্যায়ের সৎ কর্মীরা প্রতিনিয়ত ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। সম্প্রতি চন্দনাইশের পরানজুড়ানি এলাকায় অবৈধ গাছ কাটার খবর পেয়ে অভিযান চালাতে গেলে বন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর হামলা চালায় কাঠ পাচারকারীরা। এতে এক বন নিরাপত্তাপ্রহরী আহত হন।
বিশ্লেষকদের মতে, বন বিভাগের ভেতরের কিছু অসাধু চক্রের দুর্নীতি এবং মাঠপর্যায়ে পর্যাপ্ত জনবল ও নিরাপত্তার অভাব-এই দুই বাস্তবতার সুযোগ নিচ্ছে বনদস্যুরা। দুর্গম এলাকায় অভিযান পরিচালনা এবং অপরাধীদের তুলনায় বনকর্মীদের সীমিত সক্ষমতার কারণে বনাঞ্চল রক্ষা কঠিন হয়ে পড়ছে।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম দক্ষিণ বনবিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মোহাম্মদ সোহেল-এর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি এসব অভিযোগের বিষয়ে বলেন,বন বিভাগের কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে যদি চাঁদাবাজি, টোকেন বাণিজ্য বা অনিয়মের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না। আমাদের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী অপরাধের সাথে জড়িত থাকলে তদন্ত সাপেক্ষে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বনাঞ্চল এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষায় আমাদের কড়া নজরদারি অব্যাহত রয়েছে।”
চট্টগ্রাম দক্ষিণ বনবিভাগের সামনে বর্তমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো কেবল নিয়মিত অভিযান বা মামলা দায়েরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে কাঠ পাচারের পুরো চক্র, তাদের উৎস, পরিবহন রুট, গন্তব্য এবং নেপথ্যের পৃষ্ঠপোষকদের চিহ্নিত করা। সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে, দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত ও কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ না নিলে দক্ষিণ চট্টগ্রামের বনাঞ্চল অচিরেই পুরোপুরি দখলদার ও সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে।