সুস্থ ও স্বাভাবিক মানসিক বিকাশের জন্য শিশুদের প্রয়োজন মুক্ত পরিবেশ, খেলার মাঠ এবং প্রকৃতির সান্নিধ্য। অথচ স্বাধীনতার সাড়ে পাঁচ দশক পেরিয়ে গেলেও নেত্রকোনা জেলা শহরে আজও কোনো শিশুপার্ক গড়ে ওঠেনি। শহরের ঘিঞ্জি পরিবেশে চার দেয়ালের মাঝে এবং কিন্ডারগার্টেনের গণ্ডিতে বন্দী হয়ে বেড়ে উঠছে এখানকার হাজার হাজার শিশু। নাগরিক জীবনের এই করুণ বাস্তবতায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দীর্ঘদিনের উদাসীনতা চরম হতাশাজনক।
নেত্রকোনা পৌরসভার জনসংখ্যা প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার। শহরটিতে কেবল প্রাথমিক ও কিন্ডারগার্টেন স্কুলেই পড়ছে সাড়ে ১৫ হাজারের বেশি শিশু। এর সঙ্গে মাদ্রাসাপড়ুয়া শিশুদের সংখ্যা যুক্ত করলে এই পরিসংখ্যান আরও দীর্ঘ হয়। বিশাল এই শিশু-কিশোর জনগোষ্ঠীর বিনোদনের জন্য নির্দিষ্ট কোনো জায়গা না থাকায় তারা বাধ্য হয়ে স্মার্টফোন ও ভার্চ্যুয়াল জগতের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ছে। এটি তাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে। একটু স্বস্তির খোঁজে পরিবারগুলো শিশুদের নিয়ে ছয় কিলোমিটার দূরের মহাসড়কের বাইপাস কিংবা জলাশয়ের পাড়ে যেতে বাধ্য হচ্ছে, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও অস্বস্তিকর।
প্রতিবছর জেলা বাজেটে শিশুপার্কের জন্য বরাদ্দ রাখা হলেও এবং জনপ্রতিনিধিরা নানা সময়ে আশ্বাসের বাণী শোনালেও বাস্তবে কোনো উদ্যোগই আলোর মুখ দেখছে না। সাঁতার শেখা কিংবা খেলাধুলার মতো মৌলিক সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে এখানকার শিশুরা। প্রবীণ সুশীল সমাজ ও শিশু সংগঠকদের মতে, একটি পরিবেশবান্ধব শিশুপার্ক কেবল শিশুদের বিকাশে সহায়তা করে না, বরং কিশোর-তরুণদের সামাজিক বিপথগামিতা ও অপসংস্কৃতি থেকে দূরে রাখতেও কার্যকর ভূমিকা রাখে।
সম্প্রতি সুশীল সমাজের তৎপরতায় স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে নতুন করে আশ্বাসের কথা শোনা যাচ্ছে। সংসদ সদস্য ও পৌর প্রশাসক উপযুক্ত জমি নির্বাচন করে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তা যেন কেবল কাগজ-কলমে সীমাবদ্ধ না থাকে। শিশুদের ঘরে বন্দী রেখে একটি সুস্থ ও মেধাবী জাতি গঠন করা সম্ভব নয়।
নেত্রকোনায় একটি পরিকল্পিত ও আধুনিক শিশুপার্ক স্থাপন এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং এটি শিশুদের মৌলিক অধিকার। কংক্রিটের আধিক্য কমিয়ে শিশুদের মাটিতে হাঁটার সুযোগ এবং সাঁতার শেখার কর্নারসহ একটি পূর্ণাঙ্গ পার্ক নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত স্থান নির্বাচন করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এই প্রকল্প দৃশ্যমান করবে—এটাই এখন নেত্রকোনাবাসীর একমাত্র প্রত্যাশা।
সূত্র: প্রথম আলো