ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করতে নতুন করে কঠোর চাপ প্রয়োগের কৌশল নিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তেহরানের বিরুদ্ধে তার ঘোষিত ‘ইকোনমিক ডি-ডে’ অভিযানের অংশ হিসেবে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, ইরানকে কোনো ধরনের অর্থনৈতিক সহায়তা বা ‘লাইফলাইন’ প্রদানকারী দেশগুলোকে বড় ধরনের আর্থিক শাস্তির মুখে পড়তে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের ব্যয়বহুল সংঘাত শুরুর ছয় মাসের মাথায় ট্রাম্পের এই নতুন পদক্ষেপ সামনে এল। দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই তিনি বাণিজ্যযুদ্ধের মাধ্যমে মার্কিন অর্থনৈতিক শক্তিকে পররাষ্ট্রনীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা করছেন।
মঙ্গলবার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া পোস্টে ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানের বিরুদ্ধে তার এই অভিযান যেকোনো দেশের বিরুদ্ধে নেওয়া সবচেয়ে কঠোর অর্থনৈতিক পদক্ষেপ হতে যাচ্ছে। তিনি তেল পাচার, অর্থ স্থানান্তর, নগদ অর্থ লেনদেন, মানি এক্সচেঞ্জ, জাহাজ নিবন্ধন এবং বিভিন্ন ভুয়া প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ইরানকে সহায়তার পথগুলো বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট করেছেন, এসব কর্মকাণ্ড অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে, অন্যথায় সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে ভয়াবহ অর্থনৈতিক পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে।
একই দিনে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) ইরানের সঙ্গে অনির্দিষ্টকালের জন্য বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেছে। ইউএইর অভিযোগ, ইরানের সামরিক বাহিনী তাদের ভূখণ্ড লক্ষ্য করে দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। ব্র্যান্ডাইস ইউনিভার্সিটির মধ্যপ্রাচ্য অর্থনীতির অধ্যাপক নাদের হাবিবির মতে, এই নিষেধাজ্ঞা আরোপে যুক্তরাষ্ট্র ইউএইকে জোরালোভাবে প্রভাবিত করেছে। ওয়াশিংটন এখন ইরানের অন্যান্য বাণিজ্যিক অংশীদারদের ওপরও একই ধরনের চাপ প্রয়োগের পরিকল্পনা করছে, যার মধ্যে চীন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
তবে চীন ও রাশিয়ার ওপর ট্রাম্পের এই প্রভাব কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ইরানের রপ্তানি করা তেলের ৮০ শতাংশই কিনেছে চীন। চীনের অধিকাংশ তেল শোধনাগার স্বাধীনভাবে পরিচালিত হওয়ায় এবং মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থার ওপর তাদের নির্ভরতা কম থাকায়, সেখানে চাপ সৃষ্টি করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বেশ চ্যালেঞ্জিং। মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় চীনের বড় ব্যাংকগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের হুমকি দিলেও, এটি বেইজিংকে পাল্টা ব্যবস্থা নিতে প্ররোচিত করতে পারে।
কাতারের জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির সরকারের সহযোগী অধ্যাপক পল মাসগ্রেভ আল-জাজিরাকে বলেন, ট্রাম্পের এই একতরফা চাপের অভিযান কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত কঠিন। ঐতিহ্যগতভাবে এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা বহুপক্ষীয় সমন্বয়ের মাধ্যমে কার্যকর করা হয়, যার জন্য চীন, রাশিয়া এবং জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের সমর্থন প্রয়োজন। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন এক ধরনের ‘অর্থনৈতিক শীতল যুদ্ধ’ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তাই ট্রাম্প চাইবেন না দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক পুরোপুরি ঝুঁকিতে ফেলতে।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান ট্রাম্পের এই হুমকির প্রতিক্রিয়ায় জানিয়েছেন, অতিরিক্ত নিষেধাজ্ঞা কোনো সমস্যার সমাধান নয়। বরং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর দায়িত্বশীল পদক্ষেপ নেওয়া এবং কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক উপায়ে সংকট নিরসন করা উচিত। আগামী মাসে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের ওয়াশিংটন সফরের পরিকল্পনা রয়েছে, যার আগে দুই দেশই উত্তেজনা কমিয়ে একটি সাময়িক সমঝোতায় পৌঁছাতে আগ্রহী।
রাশিয়ার ক্ষেত্রে পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। যদিও ইরানের সঙ্গে রাশিয়ার বাণিজ্য চীনের তুলনায় কম, তবুও মস্কো ও তেহরান পশ্চিমা ব্যবস্থার বাইরে শক্তিশালী বাণিজ্যিক ও সামরিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দুই দেশ ২০ বছরের একটি অংশীদারত্ব চুক্তি সই করে। রাশিয়ার জ্বালানিমন্ত্রী সের্গেই তসিভিলেভের তথ্যমতে, এই চুক্তির ফলে ২০২৫ সালের প্রথম ১১ মাসে দুই দেশের বাণিজ্যের পরিমাণ বেড়ে ৪৮০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। এছাড়া এনবিসি নিউজের তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়া সমুদ্রপথে ইরানে ড্রোনের যন্ত্রাংশ, গোলাবারুদ ও টিএনটি পাঠিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ট্রাম্পের এই অর্থনৈতিক অভিযানের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। বুধবার তিনি একে ওয়াশিংটনের ‘ব্যর্থ নীতির’ ধারাবাহিকতা হিসেবে অভিহিত করে বলেন, এই নীতি শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের জন্য আরও পরাজয় ডেকে আনবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি লেখেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই ‘অর্থনৈতিক সন্ত্রাস’ বিশ্ব অর্থনীতি ও সার্বভৌমত্বের জন্য বড় হুমকি।
পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখে টিকে থাকতে ইরান এখন ব্রিকস জোটকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে। গত সপ্তাহে ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আবদোলনাসের হেম্মাতি জানিয়েছেন, ইরান ব্রিকস নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকে (এনডিবি) যোগ দেওয়ার পরিকল্পনা করছে। তিনি আরও বলেন, ব্রিকস সদস্য দেশগুলো নিজেদের মুদ্রায় লেনদেন করলে তেহরান পশ্চিমা বাজারের বাইরে অর্থায়নের নতুন পথ খুঁজে পাবে। যদিও এনডিবি এখনো ইরানের সদস্যপদ নিয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।
তেহরানের সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের বিশ্লেষক আলি আকবর দারেইনি মনে করেন, মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও ইরান এগিয়ে যাওয়ার পথ খুঁজে নেবে। তার মতে, ট্রাম্প এমন এক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছেন যা থেকে বের হওয়া বা জয়লাভ করা তার জন্য অসম্ভব। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ইরান দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ পণ্য আমদানি ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের জন্য ইউএইর ওপর নির্ভর করে আসছিল। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: একই সময়ে বেইজিংও ওয়াশিংটনের সঙ্গে একটি সাময়িক সমঝোতা চায়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ইউ জি বলেন, চলতি বছরের শেষ দিকে দুই দেশের নেতাদের মধ্যে সম্ভাব্য আরো দুটি বৈঠকেও উপসাগরীয় অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত আলোচনায় আসবে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা তেল ছাড়াও রাশিয়া ও ইরানের মধ্যে ক্যাস্পিয়ান সাগর দিয়ে অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম বিনিময়ের খবর রয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তেহরান ব্রিকসের অন্য সদস্যদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় ও ত্রিপক্ষীয় মুদ্রা সহযোগিতার বিষয়টিও বিবেচনা করছে।
সূত্র: দৈনিক আমার দেশ