মোঃ দিদারুল ইসলাম, চট্টগ্রাম >>> চট্টগ্রাম মহানগরীতে এডিস মশার উপদ্রব ও ডেঙ্গুর প্রকোপ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। মশাবাহিত এ রোগের বিস্তারে নগরবাসীর মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। স্বাস্থ্য বিভাগের সতর্কবার্তার মধ্যেও নগরের বিভিন্ন এলাকায় মশার প্রজননস্থল বেড়ে চলেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) ডিজিটাল সেবা মাধ্যম ‘আমাদের চট্টগ্রাম’ অ্যাপ চালুর এক মাসের মধ্যেই মশার উপদ্রব নিয়ে ৫৯টি অভিযোগ জমা পড়েছে বলে জানা গেছে। এর বাইরে বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা মশার উৎপাত নিয়ে নিয়মিত অভিযোগতো আছেই।সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই মাসে চট্টগ্রামে ২২৩ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হলেও চলতি আগস্টের ১৯ তারিখ পর্যন্ত এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩০০ জনে। একদিনেই নতুন করে ৪২ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন। এর মধ্যে ১৮ জন চট্টগ্রাম মহানগরীর বাসিন্দা।স্বাস্থ্য বিভাগের গত জুনের মশা জরিপেও উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। ৮ থেকে ১৭ জুন পর্যন্ত নগরের ১৮টি ওয়ার্ডে ৩৭০টি বসতবাড়ি ও ৩৪৫টি কনটেইনার পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে ৯৯টি বাড়ি বা ২৬ দশমিক ৭৫ শতাংশ এবং ১১৪টি কনটেইনার বা প্রায় ৩৩ শতাংশে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া যায়।বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো এলাকায় হাউজ ইনডেক্স ৫ শতাংশের নিচে এবং কনটেইনার ইনডেক্স ২০ শতাংশের নিচে থাকলে পরিস্থিতি সহনীয় ধরা হয়। চট্টগ্রামে এ দুটি সূচকই স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে অনেক বেশি।জরিপে পাওয়া লার্ভার প্রায় ৮০ শতাংশ ছিল ডেঙ্গুর প্রধান বাহক এডিস ইজিপটাই। বাকি ২০ শতাংশ ছিল এডিস অ্যালবোপিকটাস। স্বাস্থ্য বিভাগের জরিপের ভিত্তিতে উত্তর কাট্টলী, পাঁচলাইশ, জালালাবাদ, পশ্চিম বাকলিয়া, দক্ষিণ বাকলিয়া, দক্ষিণ হালিশহর, পাথরঘাটা ও আন্দরকিল্লা—এই আট ওয়ার্ডকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।এদিকে চসিকের মশক নিয়ন্ত্রণ বিভাগ নগরজুড়ে ৯২টি সম্ভাব্য মশার প্রজননস্থল শনাক্ত করেছে। এর মধ্যে উত্তর কাট্টলী ওয়ার্ডে ৩১টি, জালালাবাদে ২২টি, পাঁচলাইশে ১৫টি, চকবাজার ও পশ্চিম বাকলিয়ায় ২০টি এবং পাথরঘাটায় চারটি প্রজননস্থল রয়েছে।পাঁচলাইশের নয়ারহাট বাজার, চালিতাতলী নির্মাণাধীন ভবন, আতুরার ডিপো, জালালাবাদের পরিত্যক্ত ডোবা ও বালুছড়া আবাসিক এলাকার নির্মাণাধীন ভবনসহ বিভিন্ন স্থানে মশার প্রজননস্থল পাওয়া গেছে। একই চিত্র দেখা গেছে চকবাজারের চট্টগ্রাম কলেজ ও মহসিন কলেজসংলগ্ন এলাকা এবং উত্তর কাট্টলীর সাগরিকা শিল্প এলাকা ও কাস্টমস একাডেমি প্রাঙ্গণে।বিশ্ব মশা দিবস উপলক্ষে পরিস্থিতি মোকাবিলায় চসিক সপ্তাহব্যাপী বিশেষ মশক নিধন ও ক্রাশ প্রোগ্রাম হাতে নিয়েছে। এর আওতায় কোতোয়ালি মোড় ও বায়েজিদ এলাকায় ঝটিকা ওষুধ প্রয়োগ, পাথরঘাটায় সচেতনতামূলক কার্যক্রম এবং আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।চসিকের ম্যালেরিয়া ও মশক নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা মো. শরফুল ইসলাম মাহী জানান, চিহ্নিত ৯২টি প্রজননস্থলের মধ্যে ৭১টিতে লার্ভিসাইড ও এডাল্টিসাইড প্রয়োগ করে মশার প্রজনন উৎস ধ্বংস করা হয়েছে। বাকি স্থানগুলোতেও কার্যক্রম চলছে।তিনি বলেন, চসিকের পর্যাপ্ত লার্ভিসাইড, এডাল্টিসাইড ও বিটিআই মজুদ রয়েছে। তবে বর্ষায় বিভিন্ন পাত্র, নালা ও স্থানে পানি জমে নতুন করে মশার প্রজননস্থল তৈরি হওয়ায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে। নগরের প্রতিটি ওয়ার্ডে নিয়মিত মনিটরিং ও মশক নিধন কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।তবে নগরবাসীর অভিযোগ, মশক নিধনে নিয়মিত ও কার্যকর অভিযান নিশ্চিত না হলে শুধু ওষুধ ছিটিয়ে এডিস মশার বিস্তার রোধ করা কঠিন। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে ডেঙ্গুর ঝুঁকি কমানোর দাবি জানিয়েছেন তারা।