শাজাহানপুর(বগুড়া) প্রতিনিধি >>> ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার আমরুল ইউনিয়নের ডেমাজানী গ্রামের ঐতিহাসিক ‘বলিহার রাজার কাছারিবাড়ি’। কয়েক শতাব্দীর ইতিহাস বুকে ধারণ করে থাকা এ স্থাপনাটি একসময় ছিল জমিদারি প্রশাসন ও রাজস্ব আদায়ের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। কিন্তু দীর্ঘদিনের অবহেলা ও যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বর্তমানে ভবনটি জীর্ণ হয়ে পড়েছে। অরক্ষিত অবস্থায় থাকায় ধীরে ধীরে বিলীনের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে ঐতিহাসিক এ স্থাপনাটিকে ঘিরে।তবে সম্প্রতি স্থাপনাটি সংরক্ষণের বিষয়ে প্রশাসনিক উদ্যোগ নেওয়ায় নতুন করে আশার আলো দেখা দিয়েছে। স্থানীয়দের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরে চিঠি পাঠানো হয়েছে। অধিদপ্তর থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য চাওয়া হলে তার পূর্ণাঙ্গ জবাবও সম্প্রতি পাঠানো হয়েছে। এখন প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে প্রশাসন।স্থানীয়ভাবে প্রচলিত ইতিহাস অনুযায়ী, মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেবের শাসনামলে (১৬৫৮-১৭০৭ খ্রিষ্টাব্দ) নওগাঁর বলিহার জমিদার পরিবারের নৃসিংহ চক্রবর্তী শাজাহানপুর এলাকায় জায়গির লাভ করেন। এরপর প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা, জমির হিসাব রাখা এবং প্রজাদের কাছ থেকে রাজস্ব বা খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে ডেমাজানী বন্দরে গড়ে তোলা হয় এ কাছারিবাড়ি। বিভিন্ন প্রকাশিত প্রতিবেদনেও এ ইতিহাসকে স্থানীয় জনশ্রুতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
একসময় ডেমাজানী ছিল আশপাশের এলাকার গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও প্রশাসনিক কেন্দ্র। জমিদারি আমলে এ কাছারিবাড়িকে ঘিরেই পরিচালিত হতো রাজস্ব আদায় ও স্থানীয় প্রশাসনিক কার্যক্রম। জমিদার ও তাঁর প্রতিনিধিরা এখানে এসে প্রজাদের সঙ্গে দেখা করতেন এবং জমিজমা ও খাজনার হিসাব-নিকাশ দেখতেন বলে স্থানীয়দের মধ্যে প্রচলিত রয়েছে।চুন-সুরকি ও ইটের গাঁথুনিতে নির্মিত দ্বিতল ভবনটির স্থাপত্যে পুরোনো আমলের নির্মাণশৈলীর ছাপ রয়েছে। স্থানীয় ইতিহাসভিত্তিক বর্ণনা অনুযায়ী, ভবনের দোতলায় ছিল তিনটি কক্ষ। এর একটি জমিদারের জন্য নির্ধারিত থাকত এবং অন্য কক্ষগুলোতে নায়েব ও কর্মচারীরা অবস্থান করতেন। নিচতলার একটি বড় কক্ষে খাজনা আদায়ের কাজ চলত। অন্য কক্ষগুলো মালখানা ও বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজে ব্যবহৃত হতো।জনশ্রুতি রয়েছে, জমিদার বছরে বিশেষ সময়ে পালকিতে করে ডেমাজানীর কাছারিবাড়িতে আসতেন। তাঁর সঙ্গে থাকতেন রানি কুসুম কামিনী দেবী। জমিদারের আগমনকে ঘিরে কাছারিবাড়িতে প্রজাদের উপস্থিতি বাড়ত এবং খাজনা আদায়সহ নানা প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালিত হতো।
জমিদারি বিলুপ্তির পর বদলে যায় ব্যবহার
১৯৫০ সালে জমিদারি প্রথা বিলুপ্তির পর স্থাপনাটির মালিকানা ও ব্যবহারেও পরিবর্তন আসে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বিভিন্ন সময়ে সরকারি কাজে ভবনটি ব্যবহৃত হয়েছে। একসময় তহশিল বা ভূমি-সংক্রান্ত সরকারি কার্যক্রমের সঙ্গেও স্থাপনাটির ব্যবহার যুক্ত ছিল।
জমিদারি ব্যবস্থার অবসান হলেও কাছারিবাড়িটি স্থানীয় ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অন্যতম স্মারক হিসেবে টিকে থাকে। কিন্তু দীর্ঘদিন পর্যাপ্ত রক্ষণাবেক্ষণ না থাকায় ভবনের বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে। দেয়াল, দরজা-জানালা ও অন্যান্য স্থাপত্য উপাদানেও দেখা দিয়েছে ক্ষয়ের চিহ্ন।
ঐতিহাসিক স্থাপনাটির অরক্ষিত অবস্থার বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে ২০২৫ সালের একটি ঘটনায়। ওই সময় কাছারিবাড়ি থেকে ১৭টি লোহার গ্রিল খুলে নিয়ে যাওয়ার সময় স্থানীয় জনতা ইউনিয়ন ভূমি অফিসের এক কর্মচারীকে আটক করেন। পরে উদ্ধার করা গ্রিলগুলো স্থানীয় প্রশাসনের জিম্মায় দেওয়া হয়।তৎকালীন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) জানিয়েছিলেন, স্থাপনাটি সরকার দেখভাল করে এবং অনুমতি ছাড়া গ্রিল সরিয়ে নেওয়ার ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।স্থানীয়দের মতে, ঘটনাটি শুধু চুরির অভিযোগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং কয়েক শত বছরের পুরোনো ঐতিহাসিক স্থাপনাটি কতটা অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে, সেটিও এ ঘটনার মধ্য দিয়ে সামনে আসে।বলিহার রাজার কাছারিবাড়ি সংরক্ষণের বিষয়ে জানতে চাইলে শাজাহানপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ তাইফুর রহমান বলেন, “গত বছর একটি চুরির ঘটনায় কাছারিবাড়িটি সংরক্ষণের বিষয়টি সামনে আসে। স্থানীয় কিছু ব্যক্তির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে কাছারিবাড়িটি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য জেলা প্রশাসক, বগুড়ার মাধ্যমে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরে একটি চিঠি পাঠানো হয়।”তিনি বলেন, “এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর কাছারিবাড়ি সম্পর্কে আরও বিস্তারিত তথ্য—যেমন জমির খতিয়ান নম্বর, দাগ নম্বর, জমির পরিমাণসহ প্রয়োজনীয় তথ্য—চেয়ে চিঠি দেয়। সম্প্রতি ওই চিঠির পূর্ণাঙ্গ জবাবও পাঠানো হয়েছে।”ইউএনও তাইফুর রহমান বলেন, “আশা করা যায়, শিগগিরই এ বিষয়ে একটি সিদ্ধান্ত পাওয়া যাবে।”
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, বলিহার রাজার কাছারিবাড়িকে শুধু একটি পুরোনো ভবন হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি শাজাহানপুরের ইতিহাস, জমিদারি ব্যবস্থা এবং স্থানীয় প্রশাসনিক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ স্মারক। তাই স্থাপনাটির প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব নিরূপণ, সীমানা নির্ধারণ, অবৈধ দখল ও চুরি প্রতিরোধ এবং জরুরি ভিত্তিতে সংস্কার করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে ইতিহাসবিদ ও প্রত্নতত্ত্ববিদদের মাধ্যমে স্থাপনাটির প্রকৃত ইতিহাস, নির্মাণকাল ও স্থাপত্যগত বৈশিষ্ট্য নথিভুক্ত করারও দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
তাদের ভাষায়, “রাজা নেই, জমিদারি নেই—কিন্তু ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে কাছারিবাড়িটি এখনও দাঁড়িয়ে আছে।” এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে সময়ের নির্মমতায় একদিন হয়তো ঐতিহাসিক এ স্থাপনাটিও শুধু গল্প আর ছবির পাতায় বেঁচে থাকবে।ইতিহাসের এমন নিদর্শন সংরক্ষণ করা শুধু একটি পুরোনো ভবন রক্ষা নয়; বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে অতীতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে জীবন্ত রাখার দায়িত্ব। তাই ঐতিহাসিক বলিহার রাজার কাছারিবাড়ির প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব নিরূপণ করে দ্রুত সংরক্ষণ ও সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।