ঢাকাই সিনেমার সোনালি যুগের অন্যতম নায়ক ফারুক। তার অভিনয়শৈলী ও ব্যক্তিত্বে সমৃদ্ধ হয়েছে বাংলা চলচ্চিত্র। অসংখ্য নায়িকার বিপরীতে অভিনয় করে তিনি দর্শকদের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছেন। তার অন্যতম সফল ও জনপ্রিয় সহশিল্পী ছিলেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন নায়িকা ববিতা। ‘নয়নমনি’, ‘লাঠিয়াল’, ‘গোলাপি এখন ট্রেনে’ ও ‘আলোর মিছিল’-এর মতো সাড়া জাগানো সিনেমায় এই জুটির রসায়ন আজও দর্শকদের মনে গেঁথে আছে।
ফারুক ভাইয়ের প্রয়াণের কথা উল্লেখ করে ববিতা বলেন, ‘মাঝে মাঝে খুব কষ্ট লাগে যখন ভাবি তিনি আর নেই। তার সঙ্গে এই জীবনে আর কখনো দেখা হবে না, কথা হবে না। তার হাসিমুখ আর কোনোদিন দেখতে পাব না, তিনি আড্ডা মাতিয়ে রাখবেন না। পৃথিবীর মায়া ছেড়ে তিনি চলে গেছেন, তার চলে যাওয়ার কথা ভাবতেই খুব খারাপ লাগে।’
শিল্পী হিসেবে ফারুকের গুণাবলি বর্ণনা করতে গিয়ে ববিতা বলেন, ‘তিনি কেবল বড় মাপের শিল্পীই ছিলেন না, ছিলেন বড় মনের মানুষ। বিশেষ করে গ্রামীণ চরিত্রে তিনি যেভাবে মানিয়ে নিতেন, তা ছিল অতুলনীয়। মনে হতো তিনি বুঝি সত্যি সত্যি গ্রামের মানুষ। তার অভিনীত সেইসব সিনেমার আবেদন আজও অমলিন।’
শুটিংয়ের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে ববিতা জানান, তারা একসঙ্গে অনেকগুলো সিনেমায় কাজ করেছেন। তিনি বলেন, ‘এমনও হয়েছে আমরা একসঙ্গে ৩–৪টি সিনেমার শুটিংয়ে ব্যস্ত ছিলাম। একটি সিনেমার কাজ শেষ করে নতুন কোনো গ্রামে গিয়ে আরেকটি সিনেমার শুটিং শুরু করতাম। নবগ্রাম নামে একটি গ্রামের কথা আজও মনে পড়ে, যেখানে আমরা দিনের পর দিন থেকেছি। এরপর মানিকগঞ্জে গিয়ে শুরু হতো আরেকটি সিনেমার কাজ।’
‘গোলাপি এখন ট্রেনে’ সিনেমার শুটিংয়ের স্মৃতি তুলে ধরে ববিতা বলেন, ‘মানিকগঞ্জে একটি ডাকবাংলোয় আমরা থাকতাম। প্রচণ্ড শীতে নদীর পাড়ে রাতের বেলা শুটিং করেছি। শাড়ির ওপর ভারী কাপড় পরার উপায় ছিল না, কারণ সিনেমায় সেই শাড়িতেই দৃশ্য ধারণ করতে হতো। একটি ভালো সিনেমার জন্য ফারুক ভাই যে পরিমাণ কষ্ট ও পরিশ্রম করতেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয়।’
পারিবারিক সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে ববিতা বলেন, ‘ফারুক ভাই বিয়ের পর সুচন্দা আপা, চম্পা ও আমাকে তার বাসায় নিমন্ত্রণ করেছিলেন। তিনি অত্যন্ত অতিথিপরায়ণ ছিলেন। পরে ভাবীসহ আমার বাসায়ও তাদের নিমন্ত্রণ করেছিলাম। আমাদের মধ্যে পারিবারিক ও গভীর বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। সিঙ্গাপুরে তার চিকিৎসার সময় ভিডিও দেখে আশা করেছিলাম তিনি সুস্থ হয়ে ফিরবেন, কিন্তু তা আর হলো না।’
সেই সময়ের সিনেমা হলের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে ববিতা বলেন, ‘তখন একজন নায়ক হিসেবে ফারুক ভাই সিনেমা হলে যেতে পারতেন, যদিও প্রচুর ভিড় হতো। কিন্তু নায়িকা হিসেবে আমার জন্য হলে যাওয়া ছিল কঠিন। ভক্তদের ভিড় এড়াতে আমি প্রায়ই বোরকা পরে হলে যেতাম। এছাড়া সিনেমা মুক্তির আগে এফডিসিতে কলাকুশলীদের জন্য যে বিশেষ প্রদর্শনী হতো, সেখানে আমরা নিয়মিত সিনেমা দেখতাম।’
ববিতা আরও বলেন, ‘আলোর মিছিল সিনেমার কথা মানুষ এখনো মনে রেখেছেন। অনেকে আজও আমাকে সিনেমাটির কথা বলেন। ফারুক ভাই অভিনীত এই সুন্দর সিনেমাগুলো তাকে বছরের পর বছর নায়ক হিসেবে বাঁচিয়ে রাখবে।’ সবশেষে ববিতা বলেন, ‘ফারুক ভাই যেখানে আছেন, শান্তিতে থাকুন। জন্মদিনে তার প্রতি ভালোবাসা এবং প্রার্থনা রইল।’
সূত্র: The Daily Star Bangla