সাতক্ষীরা সদর উপজেলা শহর ও আশপাশের অন্তত সাতটি এলাকায় প্রায় এক মাস ধরে তিন হাজার পরিবারের পানিবন্দী থাকার ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বর্ষাকালে বৃষ্টিপাত স্বাভাবিক হলেও, বৃষ্টির পানি কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিনের মধ্যে নেমে যাওয়ার পরিবর্তে সপ্তাহের পর সপ্তাহ আটকে থাকা কোনোভাবেই সাধারণ প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে গণ্য হতে পারে না। এটি মূলত দীর্ঘদিনের অপরিকল্পিত উন্নয়ন, পানিনিষ্কাশনের প্রাকৃতিক পথ রুদ্ধ হওয়া এবং কার্যকর ব্যবস্থাপনার অভাবের ফসল। কামালনগর, ইটাগাছা, পলাশপোল, মেহেদীবাগ, রসুলপুর, রইচপুর, মধ্য কাটিয়া ও লাবসা ইউনিয়নের শৈলকের বিল–সংলগ্ন এলাকার মানুষের দুর্ভোগ এখন চরমে পৌঁছেছে। রাস্তাঘাট, বাড়ির উঠান, ফসলের জমি, এমনকি বসতঘরেও পানি ঢুকে পড়ায় জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। কোথাও কোথাও মানুষকে প্লাস্টিকের ভেলায় চলাচল করতে হচ্ছে। প্রায় ১৫ হাজার মানুষ এভাবে পানিবন্দী থাকায় তাঁদের দৈনন্দিন জীবন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও জীবিকা—সবকিছুই চরম সংকটের মুখে পড়েছে।
স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ, অপরিকল্পিতভাবে চিংড়িঘের নির্মাণ, খাল ও বিলের পানি চলাচলের পথ সংকুচিত হওয়া, কালভার্ট ও স্লুইসগেটের ত্রুটি এবং নালা-নর্দমা ভরাট হয়ে যাওয়ার কারণে পানি আটকে থাকছে। কৈখালী ও শৈলকের বিল একসময় গুরুত্বপূর্ণ পানিনিষ্কাশন পথ হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু গত কয়েক বছরে সেখানে একের পর এক মাছের ঘের গড়ে ওঠায় পানির স্বাভাবিক প্রবাহ মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। ব্যক্তিগত লাভের উদ্দেশ্যে এমনভাবে বাঁধ বা ঘের নির্মাণ করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। ভুক্তভোগীদের আন্দোলনের মুখে স্থানীয়ভাবে কয়েকটি ঘেরের অংশ কেটে সাময়িকভাবে পানি চলাচলের ব্যবস্থা করা হয়েছে, যা জরুরি পরিস্থিতিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হলেও এটি কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। বর্ষা এলেই যদি ঘের কাটতে হয়, তবে বুঝতে হবে সমস্যার মূল কারণগুলো এখনো অক্ষত রয়ে গেছে।
সাতক্ষীরার এই দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা নিরসনে এখন প্রয়োজন সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। খাল, বিল ও প্রাকৃতিক পানিনিষ্কাশনের পথগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো অবৈধ দখল ও বাধামুক্ত করতে হবে। নদী ও খালের সীমানা নির্ধারণ, পুনঃখনন এবং প্রয়োজনীয় স্থানে কালভার্ট ও স্লুইসগেট সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই। একই সঙ্গে পৌর ও গ্রামীণ এলাকায় উপযুক্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। নতুন বাড়ি, রাস্তা বা ঘের নির্মাণের ক্ষেত্রেও পানি চলাচলের পথ বাধ্যতামূলকভাবে নিশ্চিত করতে হবে। অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ বন্ধ না করলে এই সমস্যার পুনরাবৃত্তি ঘটতেই থাকবে।
জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান ১৮ আগস্ট সাতক্ষীরা সফর করে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবেন। আমরা আশা করি, এই সফর শুধু পরিস্থিতি দেখা বা নতুন কিছু সুপারিশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। সংশ্লিষ্ট সব সংস্থা, জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন ও স্থানীয় জনগণকে নিয়ে একটি বাস্তবসম্মত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে এবং তার বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। সাময়িকভাবে পানি নিষ্কাশন করলেই দায়িত্ব শেষ হবে না, বরং সাতক্ষীরার জলাবদ্ধতার একটি স্থায়ী ও টেকসই সমাধান নিশ্চিত করাই এখন সময়ের দাবি।
সূত্র: প্রথম আলো