ক্রিকেটের লড়াই কেবল ব্যাট ও বলের সীমাবদ্ধতা নয়, বরং এটি মানসিক দৃঢ়তারও পরীক্ষা। ডারউইন টেস্টের দ্বিতীয় দিনে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল সেই সত্যটিই নতুন করে প্রমাণ করল। ইনিংসের শুরুতে তানজিদ হাসান তামিম একটি সহজ ক্যাচ তুলে দিয়েছিলেন, তবে অস্ট্রেলীয় ফিল্ডাররা সেই সুযোগটি কাজে লাগাতে ব্যর্থ হন। জীবন পাওয়ার পর তানজিদ নিজেকে দারুণভাবে গুছিয়ে নেন এবং পুরো ইনিংসজুড়ে ব্যাটে অসাধারণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখেন। অভিজ্ঞ অজি বোলিং আক্রমণের সামনে তিনি নিজের লক্ষ্য থেকে একচুলও বিচ্যুত হননি, বরং একটি দীর্ঘ ইনিংস খেলার পরিকল্পনা নিয়ে অবিচল ছিলেন।
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে স্বাগতিকদের বিপক্ষে সেঞ্চুরি হাঁকানো তানজিদের ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা অর্জন। এই ইনিংসটি তার আত্মবিশ্বাসকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে, যা ভবিষ্যতের পথচলায় বড় ভূমিকা রাখবে। যদিও ব্যক্তিগতভাবে প্রত্যাশা ছিল তিনি ইনিংসটি আরও দীর্ঘ করবেন, তবুও বাংলাদেশের প্রথম ইনিংসের শক্ত ভিত গড়ার পেছনে তার অবদান অনস্বীকার্য।
অস্ট্রেলীয় বোলাররা তাদের সবটুকু সামর্থ্য দিয়ে চেষ্টা চালিয়েছেন। গতির পরিবর্তন, লাইন ও লেংথের বৈচিত্র্য, বাউন্সার, ফুলার লেংথ এমনকি স্লেজিংয়ের মতো কৌশল অবলম্বন করেও তারা খুব একটা সুবিধা করতে পারেননি। বাংলাদেশ একের পর এক জুটি গড়ে তুলেছে। অজিদের বোলিংয়ে বড় কোনো ত্রুটি খুঁজে পাওয়া কঠিন হলেও, তারা দীর্ঘ সময় ধরে স্টাম্প বরাবর ধারাবাহিকভাবে আক্রমণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশি ব্যাটাররা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে প্রতিটি বল খেলেছেন এবং কোনো সুযোগ হাতছাড়া করেননি।
সকালের সেশনে মুমিনুল হক আউট হওয়ার পর নাজমুল হোসেন শান্ত যেভাবে আত্মবিশ্বাসের সাথে ব্যাট করেছেন, তা পুরো দলের মনোবল বাড়িয়ে দিয়েছে। তানজিদ আউট হওয়ার পর মুশফিকুর রহিমও দারুণভাবে পরিস্থিতি সামলে নিয়েছেন। অস্ট্রেলিয়ার জন্য উইকেট শিকার করা ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছিল। তবে দ্বিতীয় নতুন বল নেওয়ার পর খেলার মোমেন্টাম কিছুটা বদলে যায়। মাত্র ১৮ রানের ব্যবধানে বাংলাদেশের তিন গুরুত্বপূর্ণ ব্যাটার সাজঘরে ফিরে যান। এই ছোট্ট ধস অস্ট্রেলিয়াকে ম্যাচে ফেরার একটি ক্ষীণ সুযোগ করে দেয়।
তবে বাংলাদেশের লোয়ার অর্ডার ব্যাটাররা সেই সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগতে দেননি। মেহেদী হাসান মিরাজ এবং হাসান মাহমুদ দারুণ প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন। তাদের এই লড়াই বাংলাদেশকে দিনের শেষে একটি সম্মানজনক লিড এনে দিয়েছে। এই প্রতিরোধের গুরুত্ব ম্যাচের পরবর্তী সময়ে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে।
ডারউইনের পিচটি দ্বিতীয় দিনে ব্যাটিংয়ের জন্য বেশ সহায়ক ছিল। বল ব্যাটে সুন্দরভাবে আসছিল। সেঞ্চুরিয়ান তানজিদ তামিম নিজেও উইকেটের প্রশংসা করেছেন। ব্যাটাররা বল দেরিতে খেলেছেন এবং সুইপ শটগুলো স্বচ্ছন্দে খেলতে পেরেছেন। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, অস্ট্রেলিয়াকে ট্রাভিস হেড ও মারনাস লাবুশেনের মতো পার্টটাইম বোলারদের ব্যবহার করতে হয়েছে। এই চিত্রই প্রমাণ করে যে অস্ট্রেলিয়ার মূল বোলিং পরিকল্পনা ঠিকমতো কাজ করছিল না।
অস্ট্রেলীয় পেসারদের শরীরে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট ছিল। তারা ১০০ ওভারের বেশি বল করেছেন, যা তাদের জন্য বেশ কষ্টসাধ্য। শেষ স্পেলের পর মিচেল স্টার্ককে খুঁড়িয়ে হাঁটতে দেখা গেছে। এমন দৃশ্যই বলে দেয়, বাংলাদেশ এই টেস্টে সাহস ও দৃঢ়তার সাথে লড়ছে।
ম্যাচের মাত্র দুই দিন অতিবাহিত হয়েছে। এখনই জয়-পরাজয়ের চূড়ান্ত হিসাব কষা কঠিন হলেও, বর্তমান পরিস্থিতি বেশ আশাব্যঞ্জক। তৃতীয় দিন থেকে পিচে ব্যাটিং করা আরও কঠিন হয়ে পড়তে পারে। বিশেষ করে দ্বিতীয় সেশনের পর থেকে স্পিনাররা বড় ভূমিকা পালন করতে পারেন। সেক্ষেত্রে শান্তর অধিনায়কত্ব এবং তার দুই স্পিনারের কার্যকারিতা ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। প্রথম ইনিংসে বোলারদের যেভাবে ব্যবহার করেছেন, তাতে শান্তর নেতৃত্ব বেশ প্রশংসনীয় ছিল।
অস্ট্রেলিয়া বিশ্বের এক নম্বর টেস্ট দল, তাই এখনই কোনো আগাম ভবিষ্যদ্বাণী করা সমীচীন নয়। তবে ফক্স স্পোর্টসের তথ্য যদি সঠিক হয় এবং বাংলাদেশের জয়ের সম্ভাবনা সত্যিই ৬৯ শতাংশ হয়ে থাকে, তবে তা বিশ্ব ক্রিকেটে বড় ধরনের আলোড়ন সৃষ্টি করবে। এখন সবকিছু তৃতীয় দিনের খেলার ওপর নির্ভর করছে। গল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়টি এখনো বাকি এবং বাংলাদেশের লক্ষ্য হলো অস্ট্রেলিয়াকে লড়াই থেকে আরও দূরে সরিয়ে দেওয়া।
কিন্তু ফক্স স্পোর্টস যদি ঠিক হয়, আর বাংলাদেশের জয়ের সম্ভাবনা সত্যিই ৬৯ শতাংশ হয়, তাহলে সেটি নিঃসন্দেহে ক্রিকেট বিশ্বে বড় ধরনের আলোড়ন তুলবে।
ডারউইন টেস্টের দ্বিতীয় দিনটিতে বাংলাদেশ সেটাই যেন আরেকবার মনে করিয়ে দিল।
ভবিষ্যতের সাফল্যের পথে এই ইনিংসটিই হতে পারে তার বড় আত্মবিশ্বাসের জায়গা।
ব্যক্তিগতভাবে আমি চাইছিলাম, তানজিদ ইনিংসটা আরো একটু লম্বা করুক।
আর বাংলাদেশ এতই ভালো ব্যাটিং করেছে যে, ন্যূনতম কোনো সুযোগই হাতছাড়া করেনি।
এতক্ষণ যে ইনিংসটা এত সুন্দরভাবে এগোচ্ছিল, হঠাৎ সেখানে ছোট্ট ধস।
এই প্রতিরোধের গুরুত্ব ম্যাচ যত এগোবে, ততই বোঝা যাবে।
আমি বরং একটু নিরাপদ অবস্থানে থেকে বলি, এই ম্যাচে এখন যেকোনো কিছু ঘটতে পারে!
টেস্টের শেষভাগে স্পিন বড় ভূমিকা নেবে বলেই মনে হচ্ছে।
অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী ক্রিকেট বিশ্লেষক
সূত্র: Daily Amar Desh