আর্কটিক মহাসাগরকে কেন্দ্র করে ইউরোপের সঙ্গে নতুন এক নৌবাণিজ্য পথ গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ করছে চীন। ‘আর্কটিক সিল্ক রোড’ নামে পরিচিত এই প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে পণ্য পরিবহনের সময় ও ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসবে। রাশিয়ার উত্তর উপকূল ঘেঁষে নর্দার্ন সি রুট ব্যবহারের মাধ্যমে এই বাণিজ্যিক যোগাযোগ স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা প্রচলিত সুয়েজ খালপথের একটি শক্তিশালী বিকল্প হতে পারে।
সম্প্রতি চীনা শিপিং কোম্পানি ‘সি লিজেন্ড’ এই রুটে নিয়মিত কনটেইনার জাহাজ পরিচালনার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে চীনের নিংবো বন্দর থেকে যুক্তরাজ্যের ফেলিক্সস্টো বন্দর পর্যন্ত জাহাজ চলাচলের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। অনুকূল আবহাওয়ায় এই পথে যাত্রা করলে প্রচলিত পথের তুলনায় সময় প্রায় অর্ধেক কমে আসতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আর্কটিকের বরফ গলে যাওয়ায় এই নৌপথটি বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের উপযোগী হয়ে উঠছে। নর্দার্ন সি রুট ব্যবহার করলে এশিয়া থেকে ইউরোপে পণ্য পরিবহনের দূরত্ব ও সময় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত সাশ্রয় করা সম্ভব।
চীনের জন্য এই রুটটি কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। লোহিত সাগর বা সুয়েজ খালের মতো গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথগুলোতে রাজনৈতিক অস্থিরতা, যুদ্ধ বা নিরাপত্তা ঝুঁকি দেখা দিলে আর্কটিক রুটটি বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার কারণে আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্য যে সংকটের মুখে পড়েছে, তা থেকে উত্তরণে এই নতুন পথটি বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
রাশিয়াও নর্দার্ন সি রুটের ব্যবহার বাড়াতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। চলতি বছর এই রুট দিয়ে এশিয়ায় রাশিয়ার তেল রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে ২০২৬ সালের শুরু থেকেই রাশিয়া এই পথ ব্যবহার করে এশিয়ায় তেল পাঠানোর কার্যক্রমকে আরও জোরদার করেছে।
তবে এই নতুন নৌপথের সামনে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। আর্কটিকের প্রতিকূল আবহাওয়া এবং বছরের অধিকাংশ সময় বরফে ঢাকা থাকা সমুদ্রপথ জাহাজ চলাচলের জন্য বড় বাধা। নিরাপদ নৌযাত্রার জন্য বিশেষায়িত জাহাজ, উন্নত নেভিগেশন ব্যবস্থা এবং শক্তিশালী উদ্ধার অবকাঠামোর প্রয়োজন রয়েছে। এছাড়া পরিবেশবাদীরা সতর্ক করেছেন যে, এই অঞ্চলে জাহাজ চলাচল বাড়লে তা আর্কটিকের নাজুক জীববৈচিত্র্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সব সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও, চীনের এই উদ্যোগ বিশ্ববাণিজ্যের মানচিত্র বদলে দিতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। যদি এই রুটটি সফলভাবে চালু রাখা যায়, তবে সুয়েজ খালের ওপর বৈশ্বিক নির্ভরতা কমবে এবং আর্কটিক অঞ্চলটি ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হবে। টেলিগ্রাফ, রয়টার্স, ফিন্যান্সিয়াল টাইমস ও সেফটি ফর সি-এর তথ্য অনুযায়ী এই প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
সূত্র: Daily Amar Desh