মিজানুর রহমান বিশেষ প্রতিনিধি,ফরিদপুর >>> ফরিদপুরের নগরকান্দায় প্রায় কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত একটি সড়ক নিয়ে উঠেছে নানা অনিয়ম ও নিম্নমানের কাজের অভিযোগ। নির্মাণের কয়েক বছর না যেতেই সড়কের বিভিন্ন স্থানে পাথর উঠে গিয়ে সৃষ্টি হয়েছে খানাখন্দ। সামান্য বৃষ্টিতেই জমছে পানি। ফলে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, অফিসগামী মানুষ ও হাট-বাজারে আসা পথচারীদের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে।এদিকে সড়কের কাজের বিল ছাড়ানোকে কেন্দ্র করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী ও পৌর নির্বাহী কর্মকর্তার মধ্যে বিরোধ দেখা দিয়েছে।ঠিকাদার অভিযোগ করেছেন, বকেয়া বিল ছাড়াতে পৌরসভার সচিব তার কাছ থেকে পাঁচ লাখ টাকা নিয়েছেন এবং আরও পাঁচ লাখ টাকা দাবি করেছেন। টাকা ফেরত চাইলে তাকে মারধর করে হাত ভেঙে দেওয়ার অভিযোগও করেছেন তিনি।তবে পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, ঠিকাদার নিজেই চেয়ার থেকে পড়ে আহত হয়েছেন।জানা গেছে, ২০২০ সালের ২৭ অক্টোবর সড়কটির নির্মাণকাজের টেন্ডার হয়। কাজটি পায় হোসেন এন্টারপ্রাইজ নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। পরে কাজটি কিনে নিয়ে সৈয়দ জাহানারা এন্টারপ্রাইজ নামে প্রতিষ্ঠানটি নির্মাণকাজ করে। প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী হাসিবুল হাসান আবদুল্লাহ।২০২১-২২ অর্থবছরের আইইউআইডিপি প্রকল্পের আওতায় সড়কটির কাজ শুরু হয়। চুক্তিমূল্য ধরা হয় ৯৮ লাখ ২৭ হাজার টাকা। এর মধ্যে আরসিসি সড়কের দৈর্ঘ্য ৭৪৮ মিটার এবং সংশ্লিষ্ট কাজের জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটির পাওনা প্রায় ৩২ লাখ টাকা বলে জানা গেছে। চুক্তি অনুযায়ী কাজ শুরুর পর ছয় মাসের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ করার কথা থাকলেও ২০২০ সালে শুরু হওয়া কাজ ২০২৫ সালে পৌর ইঞ্জিনিয়ার অফিসে বুঝিয়ে দেওয়া হয় বলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। তবে পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তাকে কাজ বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি।ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী হাসিবুল হাসান আবদুল্লাহ বলেন, “আমি রাস্তার কাজ শেষ করে তাদের বুঝিয়ে দিয়েছি। বাকি বিলের জন্য সচিবের কাছে যাই। কাজের বিল ছাড়াতে সচিব আমার কাছ থেকে আগে পাঁচ লাখ টাকা নিয়েছেন। এখন আরও পাঁচ লাখ টাকা দাবি করছেন। আগের টাকা ফেরত চাইলে আমাকে মারধর করে আমার হাত ভেঙে দেওয়া হয়েছে।”অভিযোগের বিষয়ে পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা হুমায়ুন কবির বলেন, “ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান যথাসময়ে রাস্তার কাজ বুঝিয়ে দিতে পারেনি। রাস্তার কাজে অনিয়ম থাকায় ৩২ লাখ টাকার বিল এখনো দেওয়া হয়নি। ১২ আগস্ট বুধবার দুপুরে বিল ছাড়াতে ঠিকাদার আমার অফিসে আসেন এবং আমাকে গালমন্দ করেন। একপর্যায়ে তিনি নিজেই চেয়ার থেকে পড়ে গিয়ে আহত হন।”নগরকান্দা উপজেলা নির্বাহী অফিসার রেজওয়ানা আফরিন বলেন, “রাস্তার কাজে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম থাকায় বিলের ৩০ লাখ টাকা দেওয়া হয়নি। বাকি টাকা নিতে ঠিকাদার হাসিবুল হাসান আবদুল্লাহ পৌরসভায় গেলে পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে তার বাকবিতণ্ডা হয়। এ সময় তিনি নিজেই পড়ে গিয়ে আহত হয়েছেন বলে শুনেছি। বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”স্থানীয়দের অভিযোগ, সড়কটি নির্মাণের পর থেকেই এর মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। পাথরের সঙ্গে প্রয়োজনীয় পরিমাণ সিমেন্ট ব্যবহার না করে নিম্নমানের ও ব্যবহৃত পাথর দিয়ে সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে বলে তাদের অভিযোগ। বৃষ্টির পানি জমে সড়কের বিভিন্ন অংশের পাথর উঠে গিয়ে বর্তমানে তা খানাখন্দে পরিণত হয়েছে। প্রায় সারা বছরই কোথাও কোথাও পানি জমে থাকে।স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সড়ক থাকলেও অনেক সময় পথচারীদের বিকল্প হিসেবে ব্যক্তিমালিকানাধীন জায়গা দিয়ে হেঁটে গন্তব্যে যেতে হয়। স্কুলগামী শিক্ষার্থী, অফিসগামী মানুষ এবং হাট-বাজারে আসা সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ এখন নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে।স্থানীয় স্কুলগামী শিক্ষার্থী, পথচারী ও এলাকাবাসী দ্রুত সড়কটি সংস্কার করে চলাচলের উপযোগী করার দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে সড়ক নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।