চীনের অর্থনীতি আপাতদৃষ্টিতে শক্তিশালী মনে হলেও এর কাঠামোগত ভিত্তি বেশ দুর্বল। দেশের অভ্যন্তরীণ প্রবৃদ্ধির গতি কমে যাওয়ায় কারখানাগুলোকে টিকিয়ে রাখতে বেইজিং ব্যাপক রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি দিচ্ছে। ফলে দেশটির অর্থনীতি এখন মূলত সরকার-সমর্থিত রপ্তানির ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, চীন টানা আরও এক বছর ১ ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি বাণিজ্য উদ্বৃত্ত নিয়ে বছর শেষ করতে যাচ্ছে। গত শুক্রবারের তথ্য অনুযায়ী, গত মাসে দেশটির রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
তবে রপ্তানির এই প্রবৃদ্ধি চীনের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি সংকটের চিত্র আড়াল করতে পারছে না। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে চীনের প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৩ শতাংশে নেমে এসেছে, যা গত তিন বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। একই সঙ্গে আবাসন খাতের সংকট তীব্রতর হচ্ছে এবং স্থানীয় সরকারগুলো ঋণের ভারে জর্জরিত। এছাড়া তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বেকারত্বের হার প্রায় ১৫ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছেছে, যা দেশটির সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
অভ্যন্তরীণ বাজারে ক্রেতাদের চাহিদা কমে যাওয়ায় প্রবৃদ্ধির চাকা সচল রাখতে চীন বিশ্ববাজারে রপ্তানির ওপর ব্যাপক ভর্তুকি দিচ্ছে। বৈদ্যুতিক গাড়ি, ইস্পাতসহ বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান সহজ শর্তে ঋণ, কর ছাড় এবং সরকারি শিল্পপার্কগুলোতে স্বল্পমূল্যে জমি সুবিধা পাচ্ছে। অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (ওইসিডি) তথ্যমতে, ২০০৫ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত চীনের ১৫টি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো অন্যান্য দেশের তুলনায় তিন থেকে আট গুণ বেশি সরকারি সহায়তা পেয়েছে।
চীনের নাগরিকদের সঞ্চয়ের প্রবণতা থাকলেও স্থবির অর্থনীতির কারণে তারা এখন খরচ করতে অনাগ্রহী। মহামারির পর গত মে মাসে দেশটিতে খুচরা বিক্রি প্রথমবারের মতো কমেছে। এছাড়া জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত কারখানা, ভবন ও যন্ত্রপাতির মতো স্থায়ী সম্পদে বিনিয়োগ ৪ দশমিক ১ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, ভোক্তাদের ব্যয় বাড়াতে হলে রাষ্ট্রীয় সম্পদ সাধারণ মানুষের হাতে স্থানান্তর করা প্রয়োজন, যা চীনের মতো সর্বাত্মকবাদী সরকারের ক্ষমতার জন্য হুমকি হতে পারে।
রপ্তানি নির্ভরতা কমিয়ে অর্থনীতি ঢেলে সাজানোর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নেতারা কয়েক দশক ধরে কথা বললেও কার্যকর পরিবর্তন আসেনি। ২০০৭ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ওয়েন জিয়াবাও চীনের অর্থনৈতিক উন্নয়নকে ‘অস্থিতিশীল, ভারসাম্যহীন ও টেকসই নয়’ বলে সতর্ক করেছিলেন। পরবর্তীতে ডোনাল্ড ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে বাণিজ্যযুদ্ধের সময় চীনের কাঠামোগত সংস্কারের দাবি তুললেও, ভর্তুকি সীমিত করার বিষয়টি আর বাস্তবায়িত হয়নি। প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংও জনকল্যাণমুখী বা ‘ওয়েলফেয়ারিজম’ ব্যবস্থার ঘোর বিরোধী, যা সাধারণ মানুষের ব্যয় করার সক্ষমতা বাড়াতে পারত।
আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর শি জিনপিংয়ের ওয়াশিংটন সফরের কথা রয়েছে। এই সফরে চীনের রপ্তানিনির্ভরতা বাণিজ্য আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রকে বাড়তি সুবিধা দিতে পারে। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য চীনের ‘রেয়ার-আর্থ এলিমেন্ট’ বা বিরল খনিজ উপাদানের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে, তবে এই অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা এখন উভয় দেশের জন্যই একটি জটিল সমীকরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চীনের এই কৌশল বিশ্ব অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদে কী প্রভাব ফেলে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
যুব বেকারত্বের হারও জেঁকে বসেছে, যা প্রায় ১৫ শতাংশের কাছাকাছি।
কিন্তু প্রধান দাবিটি—চীন যেন রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি সীমিত করে—পরবর্তী ধাপে নিয়ে যাওয়া হয়, যা আর কখনোই বাস্তবায়িত হয়নি।
এ ছাড়া শি জিনপিং ‘ওয়েলফেয়ারিজম’ বা জনকল্যাণবাদেরও তীব্র সমালোচনা করেন; অর্থাৎ, রাষ্ট্র কর্তৃক জনগণকে খুব বেশি সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী দেওয়ার ঘোর বিরোধী তিনি।
বাড়ির দাম হু হু করে কমছে এবং আবাসন নির্মাতা ও স্থানীয় সরকারগুলো ঋণের পাহাড়ের নিচে ধুঁকছে।
তবে পরবর্তী দুই দশকে এর তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি।
আর বেইজিংও এই শর্ত মানার কোনো আগ্রহ কখনো দেখায়নি।
সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর অভাবে চীনারা আগাম সতর্কতা হিসেবে সঞ্চয় করেন।
যেকোনো সর্বাত্মকবাদী (টোটালিটারিয়ান) সরকারই এটি করতে চাইবে না, কারণ এটি তাদের ক্ষমতার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।
ঠিক এ কারণেই চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এমন অনেক সংস্কারে বাধা দিয়েছেন, অর্থনীতিবিদদের মতে যেগুলো আসলে মানুষকে সঞ্চয় কমিয়ে বেশি খরচ করতে উৎসাহিত করত।
এটা ঠিক যে যুক্তরাষ্ট্রেরও চীন থেকে ‘রেয়ার-আর্থ এলিমেন্ট’ (বিরল মৃত্তিকা উপাদান) এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজ পদার্থ প্রয়োজন।
সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
সূত্র: যুগান্তর