যশোর শিক্ষাবোর্ডের এসএসসির ফলাফলে ধারাবাহিক অবনতি লক্ষ্য করা গেছে। বিগত সরকারের আমলে ‘সবাইকে পাস করিয়ে দেওয়ার’ যে প্রবণতা ছিল, তা থেকে সরে আসায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও বর্তমান বিএনপি সরকারের আমলে অনুষ্ঠিত তিনটি পরীক্ষায় পাসের হার, জিপিএ-৫ প্রাপ্তি এবং শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। এর বিপরীতে শতভাগ ফেল করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে।
যশোর শিক্ষাবোর্ডের সচিব অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আব্দুল মতিন আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেছেন যে, আওয়ামী লীগ শাসনামলে পাসের হার কৃত্রিমভাবে বাড়ানোর নির্দেশনা দেওয়া হতো। তিনি বলেন, আগে পরীক্ষার্থীরা যা-ই লিখুক, সর্বোচ্চ নম্বর দেওয়ার অলিখিত নির্দেশ ছিল। এখন সেই অসুস্থ প্রতিযোগিতার পথ থেকে সরে এসে খাতা যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে।
ফ্যাসিবাদী জমানার শেষ পরীক্ষা ২০২৪ সালে যশোর বোর্ডে পাসের হার ছিল ৯২.৩২ শতাংশ। ২০২৬ সালে তা কমে ৬৬.২৭ শতাংশে নেমে এসেছে, যা ২০২৪ সালের তুলনায় ২৬.০৫ শতাংশ কম। একই সময়ে জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২০ হাজার ৭৬১ থেকে কমে ১১ হাজার ৪৭৮ জনে দাঁড়িয়েছে, যা ৪৪.৭২ শতাংশ হ্রাস।
প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ফলাফলের চিত্র আরও হতাশাজনক। ২০২৪ সালে ৪২২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সব শিক্ষার্থী পাস করলেও ২০২৫ সালে তা ৭৫টিতে নেমে আসে। ২০২৬ সালে শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা আরও কমে মাত্র ৩৬টিতে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ দুই বছরের ব্যবধানে শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৯১.৪৭ শতাংশ কমেছে। অন্যদিকে, ২০২৪ সালে কোনো প্রতিষ্ঠানেই শতভাগ শিক্ষার্থী ফেল করেনি, কিন্তু ২০২৫ সালে এমন প্রতিষ্ঠান ছিল দুটি এবং ২০২৬ সালে তা বেড়ে ১১টিতে পৌঁছেছে।
ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার এক পরীক্ষক জানান, আগের আমলে যেকোনো উপায়ে পরীক্ষার্থীদের পাস করানোর চাপ ছিল। এখন সেই বাস্তবতা নেই, ফলে যারা প্রকৃত পড়াশোনা করেছে, তাদের ফলাফলই প্রতিফলিত হচ্ছে। যশোর বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক এসএম হোসেন আলী নিশ্চিত করেছেন যে, উত্তরপত্র মূল্যায়নে কোনো অতিরিক্ত নম্বর দেওয়া হয়নি।
পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের মতে, শিক্ষার্থীদের মোবাইল ফোনের প্রতি আসক্তি এবং ইংরেজি ও গণিতের মতো মৌলিক বিষয়ে দুর্বলতা পাসের হার কমার অন্যতম কারণ। ২০২৬ সালের পরীক্ষায় খুলনা বিভাগের ১০ জেলার ২,৫৮১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ১ লাখ ৩২ হাজার ৯৪০ জন শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছিল। এর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ৮৮ হাজার ৯৭ জন এবং ফেল করেছে ৪৪ হাজার ৮৪৩ জন। অর্থাৎ প্রতি ১০০ জনে প্রায় ৩৪ জন শিক্ষার্থী পাস করতে পারেনি।
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৫ সালে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৫১ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ফেল করেছিল ৩৬ হাজার ৫৩২ জন। এক বছরের ব্যবধানে পরীক্ষার্থী সংখ্যা ৫,৯১১ জন কমলেও ফেল করা শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১৪,২২২ জন বেড়েছে। ফেলের হার ২০২৫ সালের ২৬.৩৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৬ সালে ৩৩.৭৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
শতভাগ ফেল করা ১১টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে যশোর ও সাতক্ষীরার চারটি করে, খুলনার দুটি এবং বাগেরহাটের একটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। যশোরের প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—মণিরামপুরের হেলাঞ্চি কৃষ্ণবাটি মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়, চান্দুয়া সমসকাটি গার্লস হাইস্কুল, শার্শার সাড়াতলা জুনিয়র গার্লস হাইস্কুল ও মুক্তিযোদ্ধা জিকেজিএস সেকেন্ডারি গার্লস স্কুল। সাতক্ষীরার প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—সাতক্ষীরা নাইসা সেকেন্ডারি স্কুল, গোদারা সেকেন্ডারি স্কুল, বাবুরাবাদ ধাপুখালি সেকেন্ডারি স্কুল এবং সাহেবখালি সিদ্দিক গাজী মাধ্যমিক বিদ্যালয়। খুলনার কাতেঙ্গা মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও আসমা সরওয়ার ইসলামিক উচ্চবিদ্যালয় এবং বাগেরহাটের ডিএন একতা বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ও এই তালিকায় রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক যশোর শহরের এক শিক্ষক ও পরীক্ষক মন্তব্য করেন, বর্তমান ফলাফলই প্রকৃত চিত্র তুলে ধরছে। গত দেড় দশকে যা হয়েছে, তা ফলাফলের নামে প্রহসন ছাড়া আর কিছুই ছিল না। বোর্ড কর্তৃপক্ষ এখন বিষয়ভিত্তিক ফল পর্যালোচনার ওপর জোর দিচ্ছে, বিশেষ করে ইংরেজি ও গণিতে শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে।
শেখ হাসিনা সরকারের আমলে ‘সবাইকে পাস করিয়ে দাও’ নীতি থেকে সরে আসার কারণে অন্তর্বর্তী সরকার ও বর্তমান বিএনপি সরকারের আমলের তিনটি পরীক্ষায় পাস, জিপিএ-৫ পাওয়া ও শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কমেছে।
২০২৫ সালে এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কমে দাঁড়ায় মাত্র ৭৫-এ।
২০২৬ সালে তা আরো কমে হয়েছে ৩৬টি।
বোর্ড কর্তৃপক্ষ ও পরীক্ষকদের সঙ্গে আলাপচারিতায় এসব তথ্য উঠে এসেছে।
শুধু শিক্ষার্থীদের ফলেই নয়, প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ফলাফলেও অবনতির চিত্র স্পষ্ট।
ফলে যারা ঠিকমতো লেখাপড়া করেছে, তাদের ফলাফল সে অনুযায়ী হয়েছে।
আমরা অসুস্থ প্রতিযোগিতায় যেতে চাই না।
কিন্তু সেটা কোনো অসাধু পন্থায় নয়।
বোর্ড প্রকাশিত ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৫ সালে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৫১ পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছিল ১ লাখ ২ হাজার ৩১৯ জন।
এক বছরে ফেল করার হার বেড়েছে প্রায় ৭.৩৯ শতাংশ।
২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়ায় ১৫ হাজার ৪১৯ জনে।
২০২৬ সালে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা আরো ৩,৯৪১ জন কমে হয়েছে ১১ হাজার ৪৭৮।
পূর্ববর্তী বছরের সঙ্গে তুলনা করে দেখা যায়, ২০২৪ সালের তুলনায় এবার জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থী কমেছে ৯,২৮৩ জন।
প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ফলের হিসাবে অধোগতি আরো স্পষ্ট।
২০২২ সালে যশোর বোর্ডে শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ৫১৩।
২০২২ সালের ৫১৩টি থেকে ২০২৬ সালের ৩৬টিতে নামার অর্থ হলো, চার বছরের মধ্যে শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কমেছে ৪৭৭টি, অর্থাৎ প্রায় ৯২.৯৮ শতাংশ।
২০২৩ সালে তিনটি প্রতিষ্ঠানের কোনো পরীক্ষার্থী পাস করতে পারেনি।
এসব প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষার্থী ছিল যথাক্রমে সাত, চার, চার ও চারজন।
ফল বিশ্লেষণে তাই শুধু মোট পাসের হার নয়, এসব বিষয়ের বিষয়ভিত্তিক ফলও পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
সূত্র: Daily Amar Desh