নেত্রকোনার মদন উপজেলায় সরকারি অর্থায়নে নির্মিত দুটি ‘মুজিব কিল্লা’ বা দুর্যোগ আশ্রয়কেন্দ্র বর্তমানে মাদকসেবী ও জুয়াড়িদের নিরাপদ আস্তানায় পরিণত হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর এগুলোকে ‘দুর্যোগ আশ্রয় কেন্দ্র’ হিসেবে নামকরণ করা হলেও স্থানীয়দের কাছে এর প্রকৃত উদ্দেশ্য এখনো অস্পষ্ট। বিশাল বাজেটে নির্মিত ভবনগুলো নির্মাণের পর থেকেই কার্যত পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে, যার ফলে এগুলো জনকল্যাণে কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে মদন উপজেলার গোবিন্দশ্রী ইউনিয়নের বড্ডা এলাকায় ২ কোটি ১৩ লাখ ৫০ হাজার ৮৩৪ টাকা এবং মনিকা গ্রামের সামনে ২ কোটি ২১ লাখ ৭৯ হাজার ১৯৮ টাকা ব্যয়ে এই দুটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। বন্যার সময় গবাদিপশু রাখা এবং সাধারণ সময়ে সামাজিক অনুষ্ঠানের ব্যবহারের উদ্দেশ্যে এগুলো নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। ২০২২ সালে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও দুই বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো তা হস্তান্তর করা হয়নি।
সরেজমিনে দেখা গেছে, রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ভবনগুলোর ভেতরে থাকা সরঞ্জামাদি নষ্ট হচ্ছে এবং চারপাশ ময়লা-আবর্জনায় ভরে গেছে। স্থানীয় গোবিন্দশ্রী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাইদুল ইসলাম খান মামুন জানান, তিনি শুরু থেকেই এই কেন্দ্রগুলো ইউনিয়ন পরিষদের কাছে হস্তান্তরের দাবি জানিয়ে আসছেন। তার ভাষ্যমতে, এগুলো পরিষদের নিয়ন্ত্রণে থাকলে নিরাপত্তার জন্য গ্রাম পুলিশ নিয়োগ করা যেত, যা বর্তমানে মাদক ও জুয়ার আসর বন্ধে কার্যকর ভূমিকা রাখত।
প্রকল্পের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘তাজ এন্টারপ্রাইজ’-এর প্রতিনিধি আবু হানিফ জানান, বড্ডা আশ্রয়কেন্দ্রের কাজ দুই বছর আগেই শেষ হয়েছে, কিন্তু এখনো কেউ তা বুঝে নেয়নি। উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা হুমায়ুন কবিরের ভাষ্যমতে, মনিকা আশ্রয়কেন্দ্রের কাজ শেষ হলেও বড্ডা কেন্দ্রের কাজ পুরোপুরি সম্পন্ন না হওয়ায় কোনোটিই হস্তান্তর করা সম্ভব হয়নি।
এ বিষয়ে মদনের ইউএনও নাদির হোসেন শামীম জানান, তিনি নতুন যোগদান করায় বিষয়টি সম্পর্কে অবগত ছিলেন না। তবে বিষয়টি জানার পর তিনি জেলা প্রশাসক ও জেলা ত্রাণ পুনর্বাসন কর্মকর্তার সাথে আলোচনা করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেবেন। অন্যদিকে, জেলা ত্রাণ পুনর্বাসন কর্মকর্তা রুহুল আমিন জানান, এগুলো দেখার দায়িত্ব উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন ও ইউএনও অফিসের। মুজিব কিল্লা থেকে নাম পরিবর্তনের বিষয়ে তিনি জানান, সরকারি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমেই এই পরিবর্তন এসেছে, তার একক কোনো সিদ্ধান্তে এটি হয়নি।
বন্যার সময় গবাদিপশু রাখার জন্য এসব কেল্লা নির্মাণ করে বলে দাবি কর্তৃপক্ষের।
গোবিন্দশ্রী ইউপি চেয়ারম্যান মাইদুল ইসলাম খান মামুন জানান, আমি বলেছিলাম এই দুটি আশ্রয়কেন্দ্র হস্তান্তর হলে আমার ইউনিয়ন পরিষদে বুঝিয়ে দিতে।
ইউনিয়ন পরিষদের আওতায় আসলে আমি নিরাপত্তার জন্য দুজন গ্রাম পুলিশ নিয়োগ করতাম।
আর ওই কেন্দ্রগুলো এখন মাদকসেবী ও জুয়াড়িদের আবাসস্থলে পরিণত হয়েছে।
কেন এসব নির্মাণ করা হয়েছে, কি কাজে লাগবে?
তবে বড় বাজেটের এ প্রকল্প জনগণের কতটা কাজে আসছে, এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
প্রকল্পের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য সম্পর্কে কিছুই জানে না এলাকার মানুষ।
বিশাল ভবনে সবকিছু আছে, শুধু নেই মানুষের বিচরণ।
এলাকার মানুষ জানে না বিশাল এ ভবনগুলো ঠিক কি কারণে নির্মাণ করা হয়েছে।
তবে বন্যা হলে এগুলোতে মানুষ ও গবাদিপশু আশ্রয় নেবে।
অথচ হাওরের প্রায় সবকটি স্কুলেই রয়েছে বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র।
আমি শুনেছি বড্ডা আশ্রয়ণকেন্দ্রে মাদক সেবন ও জুয়া খেলা হয়।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা হুমায়ুন কবির জানান, একই ইউনিয়নে দুটি আশ্রয়কেন্দ্র রয়েছে।
এর মধ্যে মনিকা আশ্রয়কেন্দ্রটির কাজ সমাপ্ত হয়েছে।
তাছাড়া হস্তান্তর করবে ইউএনওর কাছে।
এখন হস্তান্তর হয়েছে কি না তা আমার জানা নেই।
মুজিব কিল্লা থেকে আশ্রয়কেন্দ্রের নাম কীভাবে পরিবর্তন হলোÑ এ ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি আরো বলেন, আমার নাম পরিবর্তন করার কোনো সুযোগ নেই।
সূত্র: Daily Amar Desh