ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাত ষষ্ঠ মাসে গড়িয়েছে। এই পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক জটিল ও উভয় সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছেন। একদিকে কঠোর সামরিক হুঁশিয়ারি, অন্যদিকে জোর কূটনৈতিক তৎপরতা—এই দুইয়ের মাঝে পড়ে ট্রাম্পের প্রশাসন ক্রমেই কোণঠাসা হয়ে পড়ছে। যুদ্ধের শুরুতেই দ্রুত জয়ের প্রতিশ্রুতি দিলেও, বাস্তবতা এখন ভিন্ন পথে হাঁটছে।
বর্তমানে ট্রাম্পকে দুটি কঠিন বিকল্পের মধ্যে যেকোনো একটি বেছে নিতে হচ্ছে। প্রথমত, ওমান ও ইরানের মধ্যে প্রস্তাবিত একটি মধ্যবর্তী চুক্তি মেনে নেওয়া। এই চুক্তি অনুযায়ী তেহরান হরমুজ প্রণালির ওপর এমন কর্তৃত্ব পাবে, যা যুদ্ধের আগে তাদের ছিল না। বিশ্লেষকদের মতে, এটি মেনে নেওয়া মানে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলার পর ইরানকে দেওয়া সবচেয়ে বড় ছাড় দেওয়া।
দ্বিতীয় বিকল্পটি হলো, যুদ্ধের মাত্রা বাড়িয়ে নতুন করে বড় ধরনের সামরিক হামলা চালানো। তবে এটি দীর্ঘমেয়াদী সংকটের জন্ম দিতে পারে। এছাড়া, আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে নতুন করে বড় ধরনের বিমান হামলা চালানো ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। আগের বোমাবর্ষণ যেখানে তেহরানকে নতি স্বীকার করাতে ব্যর্থ হয়েছে, সেখানে নতুন হামলায় সাফল্যের নিশ্চয়তাও কম।
সাবেক মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক মধ্যস্থতাকারী অ্যারন ডেভিড মিলার মন্তব্য করেছেন, ট্রাম্পের সামনে এখন কেবলই কঠিন বিকল্পের তালিকা। তিনি হয়তো বুঝতে পারছেন যে, যুদ্ধ অনির্দিষ্টকাল চালানো সম্ভব নয়। কোথাও না কোথাও ছাড় দিতেই হবে এবং হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতাকে মেনে নেওয়া সেই ছাড়ের অংশ হতে পারে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও অবশ্য দৃঢ় অবস্থানে রয়েছেন। তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, বিশ্বজুড়ে তেল ও এলএনজি পরিবহনের অন্যতম প্রধান পথ হরমুজ প্রণালি কোনোভাবেই ইরানের নিয়ন্ত্রণে বা তাদের ফি আদায়ের অধীনে থাকতে পারে না। এটিকে উন্মুক্ত আন্তর্জাতিক পানিপথ হিসেবেই রাখতে হবে। তবে ট্রাম্প অতীতেও রুবিওর বক্তব্য খণ্ডন করেছেন, তাই এবারও ভিন্ন কিছু ঘটার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
হোয়াইট হাউজের এক কর্মকর্তার তথ্যমতে, আগামী নভেম্বরের নির্বাচনের সময়ও যুদ্ধ কোনো না কোনোভাবে অব্যাহত থাকবে বলে প্রশাসন ধরে নিয়েছে। যদিও ট্রাম্প দাবি করে আসছেন যে, ইরানের বহু নেতাকে হত্যা ও তাদের সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস করে তিনি জয়ী হয়েছেন, কিন্তু অধিকাংশ বিশ্লেষক মনে করেন, যুদ্ধের মূল লক্ষ্য অর্জনে তিনি ব্যর্থ হয়েছেন।
ট্রাম্প সম্প্রতি জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যের মিত্র দেশগুলোর অনুরোধে তিনি বড় ধরনের নতুন হামলার পরিকল্পনা স্থগিত করেছেন। তবে কূটনীতি ব্যর্থ হলে কঠোর আঘাত হানার হুমকিও দিয়ে রেখেছেন। লস ভেগাসে এক সমাবেশে তিনি বলেন, তিনি মানুষ হত্যা করতে চান না এবং চুক্তি করতেই বেশি পছন্দ করেন। তবে তিনি এও স্বীকার করেন, পরিস্থিতি অনুযায়ী শেষ পর্যন্ত হয়তো কঠোর পদক্ষেপ নিতেই হতে পারে।
ইরান-ওমান চুক্তির বিষয়ে মার্কিন অবস্থান এখনো স্পষ্ট নয়। ইরানি সূত্র ও আঞ্চলিক কর্মকর্তাদের মতে, প্রস্তাবিত শর্ত অনুযায়ী পারস্য উপসাগরে প্রবেশকারী জাহাজের ওপর তেহরান কিছু তদারকির সুযোগ পাবে। ট্রাম্প এই চুক্তিকে ‘আসন্ন’ বললেও ইরানি কর্মকর্তারা বলছেন, অনেক খুঁটিনাটি বিষয় এখনো অমীমাংসিত।
জুন মাসে স্বাক্ষরিত খসড়া সমঝোতা স্মারকটি ইতোমধ্যেই ব্যর্থ হয়েছে। ওই চুক্তিতে ইরানকে নিষেধাজ্ঞা শিথিলের যে সুযোগ দেওয়া হয়েছিল, তা রিপাবলিকান পার্টির ভেতরেই তীব্র সমালোচনার জন্ম দিয়েছিল। বর্তমান পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের রাজনৈতিক কৌশলের পরিধি সংকুচিত হয়ে আসছে, কারণ যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি ও যুদ্ধের দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে সাধারণ আমেরিকানদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে।
ইরানও পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছে। ওয়াশিংটনের উপসাগরীয় মিত্রদের সতর্ক করে তেহরান জানিয়েছে, কোনো নতুন মার্কিন হামলা হলে তাদের জ্বালানি অবকাঠামোতে পাল্টা আঘাত করা হবে।
সাবেক মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তা জোনাথন প্যানিকফের মতে, চীন, রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়া এই যুদ্ধ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। তিনি বলেন, আগামী বছরগুলোতে মার্কিন সামরিক সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা কোথায় হতে পারে, তারা এখন সেটাই পর্যবেক্ষণ করে শিখছে।
সবশেষে, ‘ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসিস’-এর গবেষক বেনাম বেন তালেবলু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেছেন, ইরান নভেম্বরের আগে ট্রাম্পকে একটি উভয় সংকটে ফেলার চেষ্টা করছে। ট্রাম্প প্রশাসনের উচিত তাড়াহুড়ো করে কোনো সিদ্ধান্ত না নেওয়া।
তবে রয়টার্সের প্রশ্নের জবাবে এক মার্কিন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, যেকোনো ‘সাময়িক’ নৌচলাচল পথ হবে সম্পূর্ণ ‘বাধাহীন’ এবং তা কোনো একপক্ষের নিয়ন্ত্রণে থাকবে না।
ওয়াশিংটন চায় এই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হোক ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, যা ছিল ট্রাম্পের সামরিক অভিযানের ঘোষিত প্রধান লক্ষ্য।
মাত্র কয়েক সপ্তাহে শেষ করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে শুরু করা এই অপ্রিয় যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজতে গিয়ে এখন চরম বিপাকে পড়েছেন তিনি।
এর মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি পরিবহনের এই গুরুত্বপূর্ণ প্রণালিতে ইসলামি প্রজাতন্ত্রটির তদারকি অন্তত সাময়িকভাবে হলেও আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পাবে, যা প্রতিরোধ করার অঙ্গীকার করেছিল ট্রাম্প প্রশাসন।
ট্রাম্প অবশ্য এই দুই পথের বাইরে গিয়ে বর্তমানের নড়বড়ে ‘স্ট্যাটাস কো’ বা বিরাজমান পরিস্থিতি বজায় রাখার সিদ্ধান্তও নিতে পারেন।
সেক্ষেত্রে ইরানের বন্দরগুলোতে নৌ-অবরোধ বহাল রাখা এবং জাহাজে যেকোনো হামলার জবাবে মাঝে মাঝে প্রতিশোধমূলক আক্রমণ চালানো অব্যাহত থাকবে।
কিন্তু এই কৌশলটিও ট্রাম্পকে এমন কোনো সম্মানজনক প্রস্থানের পথ দেবে না, যা মধ্য-এপ্রিলের মধ্যেই যুদ্ধ শেষ হওয়ার প্রাথমিক ধারণার সঙ্গে মেলে।
ইরান-ওমান চুক্তি চূড়ান্ত হলে বা ওয়াশিংটন-তেহরান আলোচনা পুনরায় শুরু হলেও বিশেষজ্ঞরা চূড়ান্ত শান্তি চুক্তি নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন।
এমনকি সেপ্টেম্বর থেকেই কিছু রাজ্যে আগাম ভোটগ্রহণ শুরু হচ্ছে।
প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার সময় ট্রাম্প বিদেশনীতিতে অযথা হস্তক্ষেপ না করা এবং আমেরিকানদের অর্থনৈতিক সমস্যায় নজর দেওয়ার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, বর্তমান পরিস্থিতি তার ঠিক বিপরীত।
ফলে কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ে থাকা রিপাবলিকান পার্টির জন্য এটি মারাত্মক রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করছে।
এমন পরিস্থিতির মধ্যেই ট্রাম্পের বক্তব্যে অসামঞ্জস্য ফুটে উঠেছে।
তবে একটা পর্যায়ে গিয়ে আমাদের সেটা করতেও হতে পারে।’
এমনকি যে সমস্ত ইরান-বিরোধী নীতি নির্ধারকরা ট্রাম্পের এই যুদ্ধকে সমর্থন করেছিলেন, তারাও এখন সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন।
কর্তৃক সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
সূত্র: যুগান্তর