ছাত্র-নেতৃত্বাধীন ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার টানা ১৫ বছরের শাসনের অবসানের দুই বছর পূর্ণ হলো আজ। এই অভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক নতুন সূচনার আশা জাগিয়েছিল। তবে এই বার্ষিকী এমন এক সময়ে উদযাপিত হচ্ছে, যখন ভারত আশ্রয় নেয়া শেখ হাসিনা প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে বক্তব্য দেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। নয়াদিল্লিতে ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব অব সাউথ এশিয়া আয়োজিত একটি অনলাইন অনুষ্ঠানে তার বক্তব্য রাখার কথা রয়েছে, যেখানে তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় এবং ক্রিকেটার সাকিব আল হাসানও উপস্থিত থাকবেন বলে জানা গেছে। এই ঘোষণার পর ঢাকার পক্ষ থেকে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানানো হয়েছে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম স্পষ্ট করেছেন যে, বাংলাদেশ এ বিষয়ে ভারতের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, ভারত যদি তার ভূখণ্ড থেকে একজন ‘পলাতক’ ব্যক্তিকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগ দেয়, তবে তা দুই দেশের সাম্প্রতিক উন্নত সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। ভারতকে তার অবস্থান পরিষ্কার করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, প্রয়োজনে বাংলাদেশ কূটনৈতিকভাবে বিষয়টি এগিয়ে নেবে। বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল, কারণ গত দুই বছর ধরে শেখ হাসিনাকে ফেরত চেয়ে আসছে বাংলাদেশ। গত বছর একটি ট্রাইব্যুনাল ২০২৪ সালের দমনপীড়নের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে তাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ওই অভিযানে প্রায় ১৪০০ জন নিহত হতে পারেন। শেখ হাসিনা এই রায়কে অবৈধ বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং সম্প্রতি একাধিকবার ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন। ঢাকার কাছে নয়াদিল্লিতে তার এই উপস্থিতি কেবল একটি বক্তব্য নয়, বরং জুলাই অভ্যুত্থানের পর পরিবর্তিত পরিস্থিতির এক বড় পরীক্ষা।
জুলাই অভ্যুত্থানের মূল লক্ষ্য ছিল বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়া এবং দায়মুক্তির সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা। কিন্তু দুই বছর পরও সেই প্রত্যাশার অনেকটাই অপূর্ণ রয়ে গেছে। ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টির নেতা নাহিদ ইসলাম রায়েরবাজারে নিহতদের কবর জিয়ারত করে স্বীকার করেছেন যে, বাংলাদেশ এখনো সেই স্বপ্নের রাষ্ট্রে পরিণত হয়নি। দলটির রাজনৈতিক যাত্রা এবং জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে নির্বাচনী জোট গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়ে দলের ভেতরেই সমালোচনা ও পদত্যাগের ঘটনা ঘটেছে। ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম নেতা মাহফুজ আলমও ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। এছাড়া সংস্কারের গতি ও পরিধি নিয়ে মতপার্থক্য অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনৈতিক ঐকমত্যকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ সাম্প্রতিক এক কলামে লিখেছেন, আন্দোলনের সময়কার সেই উদ্দীপনা ও আশা অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে, যার পেছনে তিনি ফ্যাসিবাদী রাজনৈতিক সংস্কৃতির পুনরুত্থানকে দায়ী করেছেন।
বামপন্থি সংগঠনগুলোও সামাজিক ন্যায়বিচার ও জবাবদিহির অভাব নিয়ে সরব। আন্দোলনের সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা অনেক নারী এখন নিজেদের উপেক্ষিত মনে করছেন এবং অনলাইন ও বাস্তব জীবনে হয়রানির শিকার হওয়ার অভিযোগ তুলেছেন। তবে শেখ হাসিনা-পরবর্তী বাংলাদেশে ভারতের প্রতি অবিশ্বাস ও ক্ষমতাচ্যুত নেত্রীকে আশ্রয় দেয়ার বিষয়টি সবচেয়ে বেশি স্থায়ী হয়েছে। সীমান্ত পরিস্থিতি এখনো উত্তেজনার বড় কারণ। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্যমতে, ২০২৫ সালে বিএসএফ-এর হাতে ৩৪ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন এবং ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে আরও অন্তত ১০ জন প্রাণ হারিয়েছেন। এছাড়া ঢাকা অভিযোগ করেছে, আগস্ট ২০২৪ থেকে বিএসএফ হাজারো মানুষকে জোরপূর্বক বাংলাদেশে ঠেলে পাঠিয়েছে। জুনে নয়াদিল্লিতে সীমান্তরক্ষী বাহিনীগুলোর বৈঠকে বিষয়টি তোলা হলেও কোনো কার্যকর অগ্রগতি হয়নি।
কূটনৈতিক সম্পর্কের টানাপোড়েনও স্পষ্ট। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জুনে তার প্রথম বিদেশ সফরে ভারত এড়িয়ে মালয়েশিয়া ও চীন সফর করেছেন, যা ভারতীয় গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ভারত সফর এবং ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নেয়ার আমন্ত্রণ ঢাকার কাছে এখনো ‘পর্যালোচনাধীন’ রয়েছে। এছাড়া, ২৮ জুন থেকে পর্যটন ভিসা চালু হলেও অনলাইন অ্যাপয়েন্টমেন্ট ব্যবস্থায় ব্যাপক জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে। সাধারণ আবেদনকারীদের জন্য ইন্ডিয়ান ভিসা অ্যাপ্লিকেশন সেন্টারে পাসপোর্ট জমা দেয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে, যা দুই দেশের জনগণের মধ্যকার সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
শেখ হাসিনার বক্তব্য ও বিতর্কিত লেখিকা তসলিমা নাসরিনের জুলাই অভ্যুত্থানকে ‘বিপর্যয়কর’ বলে মন্তব্য করা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। তসলিমা নাসরিন শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরতে দেয়া এবং আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছেন। সব মিলিয়ে, ২০২৪ সালের আগস্টের আগের তুলনায় বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতের অবস্থান এখন অনেক বেশি বিতর্কিত ও প্রশ্নবিদ্ধ। ঢাকার কূটনৈতিক প্রতিবাদ এটাই প্রমাণ করে যে, শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিক মঞ্চ ব্যবহারের সুযোগ দেয়াকে বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের একটি বড় পরীক্ষার বিষয় হিসেবে দেখছে।
জুলাইয়ের অন্য প্রতিশ্রুতিগুলো ম্লান: ২০২৪ সালের আন্দোলনের লক্ষ্য শুধু শেখ হাসিনাকে ক্ষমতা থেকে সরানো ছিল না।
ফেব্রুয়ারিতে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সরকার গঠনের পাশাপাশি গণভোটে জুলাই সনদ অনুমোদিত হয়।
অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ, যিনি জুলাই অভ্যুত্থানের সময় গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক কণ্ঠ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিলেন, সম্প্রতি এক কলামে লিখেছেন যে- ২০২৪ সালের আন্দোলন ঘিরে তৈরি হওয়া উদ্দীপনা, আবেগ ও আশা অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে।
এটি একই সঙ্গে মনে করিয়ে দেয়, জুলাই অভ্যুত্থানের পর কত কিছু বদলেছে, আবার কত কিছু এখনো বদলায়নি।
আন্দোলন বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার পাশাপাশি শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এবং পৃষ্ঠপোষকতা ও দায়মুক্তির রাজনীতিমুক্ত একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল- যে সংস্কৃতিকে অনেকেই আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনের সঙ্গে যুক্ত করতেন।
আন্দোলনের সামনের সারির ছাত্রনেতাদের গড়া দলটি ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচনের আগে ইসলামপন্থি দল জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে নির্বাচনী জোট গঠন করে।
এই সিদ্ধান্তে দলের ভেতরে পদত্যাগের ঘটনা ঘটে এবং সমালোচনা শুরু হয় যে আন্দোলন ক্রমেই ইসলামপন্থি প্রভাবের অধীনে চলে যাচ্ছে।
আন্দোলনের বৃহত্তর সংস্কার কর্মসূচিতেও অগ্রগতি সীমিত।
এতে সংবিধান ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সংস্কারের একটি রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছিল।
অথচ নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে সীমান্ত হত্যা ও পুশ-ইনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা বলেছিল বিএনপি সরকার।
জনগণ পর্যায়ের সম্পর্ক স্বাভাবিক করাও সহজ হয়নি।
ভারতে যাওয়ার পর থেকে তিনি বারবার এমন বক্তব্য দিয়েছেন, যেগুলো ঢাকার মতে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের শামিল।
নয়াদিল্লি এই পরিবর্তনের প্রতি কীভাবে সাড়া দেয়, তার ওপর আগামী বহু বছর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের গতিপথ নির্ভর করতে পারে।
সূত্র: Manab Zamin – International