আব্দুল্লাহ্ আল মারুফ, চট্টগ্রাম >>> জীবনের ভিন্ন ভিন্ন সংকট ও না পাওয়ার বেদনা নিয়ে বুধবার চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে হাজির হয়েছিলেন একদল অসহায় মানুষ। কারও স্বামী এক বছর ধরে নিখোঁজ, কারও বসতঘর ভেসে গেছে বনয়ায়, আবার কেউ লড়ছেন ক্যান্সারের সঙ্গে। এমন হাহাকারের মাঝে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞার সাপ্তাহিক গণশুনানি পরিণত হয়েছিল অসহায় মানুষের নির্ভরতার ঠিকানায়। ধৈর্য ও মনোযোগের সঙ্গে ১৮ জন সেবাপ্রার্থীর কথা শুনে তাৎক্ষণিক সুরাহা এবং সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন এই মানবিক জেলা প্রশাসক।বুধবার (২২ জুলাই) অনুষ্ঠিত এই গণশুনানিতে চট্টগ্রাম মহানগর ও বিভিন্ন উপজেলা থেকে আসা মানুষের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত দুর্দশার চিত্র উঠে আসে।গণশুনানিতে কথা বলতে বলতে বারবার চোখের পানি মুছছিলেন মোসাম্মৎ মাইনা খাতুন। প্রায় এক বছর আগে ট্রলারে মাছ ধরতে গিয়ে নিখোঁজ হন তাঁর স্বামী আজাদ। দুই অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তান ও স্ট্রোক আক্রান্ত নিজের চিকিৎসা খরচ জোগাতে দ্বারে দ্বারে ঘুরছিলেন তিনি। জেলা প্রশাসক তাঁর আকুতি শুনে তাৎক্ষণিক আর্থিক সহায়তা দেন এবং নিখোঁজ স্বামীর সন্ধানে প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেন।বাঁশখালীর ইলশা গ্রামের রাহাত বন্যায় কাঁচা ঘর ও ফসল হারিয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছিলেন। তাঁর স্ট্রোক আক্রান্ত ও শারীরিকভাবে অক্ষম বাবার পুনর্বাসনের আকুতি শুনে জেলা প্রশাসক তাৎক্ষণিক সহায়তার ব্যবস্থা করেন।কিডনি জটিলতা ও বহুমূখী রোগে আক্রান্ত বোয়ালখালীর মো. শাহাজাহান এবং সড়ক দুর্ঘটনায় পা ভাঙা সেলস রিপ্রেজেন্টেটিভ মোহাম্মদ আবু কাউছারকে চিকিৎসার জন্য দেওয়া হয় আর্থিক সহায়তা।অভাবের তাড়নায় পড়াশোনা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হওয়া সরকারি সিটি কলেজের অনার্স প্রথম বর্ষের ছাত্রী মিফতাহুল জান্নাত রিয়াকে দেওয়া হয় বিশেষ আর্থিক অনুদান। এছাড়া ক্যান্সারে আক্রান্ত জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের অফিস সহায়ক নিলুফার ইয়াসমিন এবং জীবিকার সন্ধানে এসে সর্বস্বান্ত হয়ে বাড়ি ফেরার ভাড়াও না থাকা দিনাজপুরের শফিকুল ইসলামকে তাৎক্ষণিক সহায়তা প্রদান করা হয়।গণশুনানিতে আসা সাতজন অসহায় ব্যক্তি ও একজন শিক্ষার্থীকে সরাসরি আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়। পাশাপাশি ২১টি পরিবারের মাঝে চাল, ডাল, তেল, চিনি, লবণ ও মসলাসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হয়। প্রতিটি আবেদনের বিপরীতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন ডিসি।শারীরিক উপস্থিতির পাশাপাশি এদিন প্রবাসীদের অভিযোগ শোনার জন্য বিশেষ অনলাইন গণশুনানিও অনুষ্ঠিত হয়। এতে এক প্রবাসী জমিজমা সংক্রান্ত জবরদখলের অভিযোগ জানালে, জেলা প্রশাসক তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে দ্রুত আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন।চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের এই সাপ্তাহিক গণশুনানি এখন আর কেবল আবেদন নেওয়ার আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ নেই। কেউ চিকিৎসার খরচ, কেউ পড়ার সুযোগ, কেউ ঘর বাঁধার স্বপ্ন আর কেউ বাড়ি ফেরার ভাড়ার সংস্থান নিয়ে ফিরেছেন এই কক্ষ থেকে। সহায়তার এই ছোট্ট প্রয়াস হয়তো সবার সব সংকট দূর করতে পারবে না, তবে মানুষের মনে এই বিশ্বাস দৃঢ় করেছে যে-রাষ্ট্র ও প্রশাসন প্রকৃত অর্থেই তাদের পাশে রয়েছে।