আব্দুল্লাহ আল মারুফ >>> দেশীয় ফলের স্বাভাবিক স্বাদ ও গুণগত মান রক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। তিনি বলেছেন, ফলের চিরচেনা স্বাদ ও পুষ্টিগুণ হারিয়ে গেলে মানুষের, বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের শিশুদের মধ্যে ফল খাওয়ার আগ্রহ কমে যায়। তাই শুধু উৎপাদন বাড়ানোই নয়, ফলের আসল স্বাদ ও পুষ্টিগুণ সংরক্ষণেও সমানভাবে মনোযোগ দিতে হবে।বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) চট্টগ্রাম জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্যোগে আয়োজিত তিন দিনব্যাপী জেলা ফল মেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। এবারের মেলার প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে-করব মোরা ফল চাষ, সংরক্ষণ করব বারো মাস।প্রধান অতিথির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক বলেন, বর্তমান সময়ে মানুষের খাদ্যাভ্যাসে এক বড় ধরনের নেতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। তরুণ ও শিশুদের মধ্যে জাঙ্ক ফুডের প্রতি ঝোঁক বাড়ছে এবং একই সাথে ফল খাওয়ার প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে কমছে। এর ফলে শরীরে প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও পুষ্টির ঘাটতি তৈরি হচ্ছে, যা সামগ্রিক শারীরিক ও মানসিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করছে।তিনি উল্লেখ করেন, সুস্থ শরীরে সুস্থ মনের বাস। শারীরিকভাবে দুর্বল মানুষ কখনো পূর্ণাঙ্গভাবে সুস্থ ও ইতিবাচক চিন্তা করতে পারে না। একটি সুস্থ ও মেধাবী সমাজ গড়তে হলে আমাদের অবশ্যই পুষ্টিকর ও প্রাকৃতিক খাদ্যাভ্যাসে ফিরে আসতে হবে।দেশীয় ফলের গুরুত্ব তুলে ধরে মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, বাংলাদেশের জলবায়ু ও প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ দেশীয় ফল ও বৃক্ষই আমাদের প্রকৃত সম্পদ। কিন্তু ইদানীং অনেক ফলের স্বাভাবিক স্বাদ হারিয়ে যাচ্ছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়।ফল পাকাতে ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহারের তীব্র সমালোচনা করে জেলা প্রশাসক বলেন, কার্বাইডসহ বিভিন্ন বিষাক্ত রাসায়নিক ব্যবহার করে কৃত্রিম উপায়ে ফল পাকানোর প্রবণতা যেকোনো মূল্যে বন্ধ করতে হবে। অসাধু ব্যবসায়িক লাভের জন্য মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্যকে ঝুঁকিতে ফেলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। নিরাপদ ফল উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে কৃষক, ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে আরও বেশি দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।চট্টগ্রামে দেড় কোটি বৃক্ষরোপণের লক্ষ্যমাত্রা পরিবেশ রক্ষা ও ফলদ বৃক্ষ রোপণের রাষ্ট্রীয় কর্মসূচির কথা উল্লেখ করে ডিসি জানান, প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির অংশ হিসেবে চট্টগ্রামে আগামী পাঁচ বছরে প্রায় দেড় কোটি চারা রোপণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে চলতি বছরেই জেলায় প্রায় ১৮ লাখ বৃক্ষ রোপণের পরিকল্পনা রয়েছে। ইতিমধ্যে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে সাত লাখ বৃক্ষ রোপণ করা হয়েছে এবং বন বিভাগসহ অন্যান্য সংস্থাও কাজ করে যাচ্ছে। পাশাপাশি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এ বছর আরও ৫৭ হাজার ফলদ ও অন্যান্য বৃক্ষ রোপণ করবে।এর আগে জেলা প্রশাসক ফিতা কেটে তিন দিনব্যাপী এই ফল মেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন এবং বিভিন্ন উপজেলা থেকে আসা কৃষকদের ফলের প্রদর্শনী স্টলগুলো ঘুরে দেখেন। প্রদর্শনীতে চট্টগ্রামে উৎপাদিত প্রায় ৬০ প্রজাতির প্রচলিত ও অপ্রচলিত বৈচিত্র্যময় ফল এবং সেগুলোর পুষ্টিগুণ প্রদর্শন করা হয়।অনুষ্ঠানের শুরুতে ফলের পুষ্টিগুণ, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এবং বাণিজ্যিক ফল উৎপাদনের গুরুত্ব তুলে ধরে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (উদ্যান) কৃষিবিদ রঘুনাথ নাহা।কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর চট্টগ্রামের উপপরিচালক কৃষিবিদ আপ্রু মারমার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা, জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএআরআই) প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তাসহ কৃষি মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন স্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।সভাপতির সমাপনী বক্তব্যে কৃষিবিদ আপ্রু মারমা পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সাধারণ মানুষকে নিজ নিজ বসতবাড়ির আঙিনায় অন্তত একটি করে ফলদ গাছ রোপণের আহ্বান জানান। অনুষ্ঠান শেষে মেলায় আসা স্থানীয় কৃষক ও বিভিন্ন বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মাঝে বিনামূল্যে ফলদ গাছের চারা বিতরণ করা হয়।