আব্দুল্লাহ, আল মারুফ >>> সবুজ পাহাড় আর লেকের মনোরম পরিবেশ দেখে একে কোনো পর্যটন কেন্দ্র বা রিসোর্ট মনে হতে পারে। তবে এটি আসলে দেশের অন্যতম বৃহৎ এবং সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী এক শিল্পাঞ্চল-কোরিয়ান এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোন (কেইপিজেড)। চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ তীরে অবস্থিত এই জোনটি এখন শুধু রপ্তানি আয়ের উৎস নয়, বরং প্রকৃতি বাঁচিয়ে কীভাবে শিল্পায়ন সম্ভব, তার এক অনন্য বৈশ্বিক মডেল হয়ে দাঁড়িয়েছে।চার দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক ও জুতা শিল্পের বিপ্লবের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন দক্ষিণ কোরিয়ার প্রখ্যাত উদ্যোক্তা কিহাক সাং। তাঁরই দূরদর্শী স্বপ্নে আবর্তিত এই কেইপিজেড আজ বদলে দিয়েছে একসময়ের অনাবাদী ও কৃষিনির্ভর আনোয়ারা-কর্ণফুলী অঞ্চলের চিরচেনা মানচিত্র। সৃষ্টি করেছে এক নতুন অর্থনৈতিক বাস্তবতা।সাধারণত শিল্পাঞ্চল বলতেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে ধোঁয়া, কংক্রিটের জঙ্গল আর দূষণ। কিন্তু কেইপিজেড হেঁটেছে সম্পূর্ণ উল্টো পথে। ২ হাজার ৪৯২ একরের এই বিশাল সাম্রাজ্যের মাত্র ৪৮ শতাংশ এলাকায় গড়ে তোলা হয়েছে কারখানা। বাকি ৫২ শতাংশ জায়গা রাখা হয়েছে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিকভাবে সবুজ।পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় এ পর্যন্ত রোপণ করা হয়েছে ২০ লাখেরও বেশি গাছ।বৃষ্টির জল ধরে রাখা এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ঠিক রাখতে তৈরি করা হয়েছে কৃত্রিম লেক ও বড় বড় জলাধার। কারখানার ভেতরের পরিবেশ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ব্যবহার করা হচ্ছে আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি।বর্তমানে কেইপিজেডে সচল রয়েছে ৪৮টি অত্যাধুনিক শিল্পকারখানা। বিশ্বমানের জুতা, পোশাক ও টেক্সটাইলসহ বিভিন্ন বহুমুখী পণ্য উৎপাদিত হচ্ছে এখানে, যা সরাসরি যুক্ত হচ্ছে দেশের রপ্তানি আয়ের মূল স্রোতে।কেইপিজেড কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্যমতে, বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত এই জোন থেকে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার (সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা) পণ্য বিদেশে রপ্তানি করা হয়েছে।বর্তমানে এই শিল্পাঞ্চলে প্রত্যক্ষভাবে কাজ করছেন প্রায় ৩৫ হাজার শ্রমিক ও কর্মকর্তা। যার একটি বিশাল বড় অংশই স্থানীয় নারী সমাজ। একসময় ঘরে থাকা গ্রামীণ নারীরা এখন এখানে কাজ করে স্বাবলম্বী হচ্ছেন, যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে নীরব বিপ্লব ঘটিয়েছে।কেইপিজেড সূত্রে জানা গেছে, চলমান নতুন প্রকল্পগুলো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে এবং নতুন বিনিয়োগের কাজ শেষ হলে আগামী দুই বছরের মধ্যে এখানে কর্মসংস্থানের পরিধি দ্বিগুণ হয়ে যাবে। তখন প্রায় ৭০ হাজার মানুষের রুটি-রুজির ঠিকানা হবে এই কেইপিজেড।শিল্প, প্রকৃতি আর মানবসম্পদের এমন অপূর্ব সমন্বয় দক্ষিণ চট্টগ্রামকে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক হাব (Hub)-এ পরিণত করেছে। কিহাক সাংয়ের এই পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ বাংলাদেশের টেকসই শিল্পায়নের ইতিহাসে একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে।