আব্দুল্লাহ।আল মারুফ, চট্টগ্রাম।। সাধারণত যেকোনো পেশামূলক প্রশিক্ষণ শেষে অংশগ্রহণকারীদের হাতে শুধু একটি কাগজের সনদপত্রই তুলে দেওয়া হয়। কিন্তু চট্টগ্রামে দেখা গেল এক মানবিক ও ব্যতিক্রমী চিত্র। ছয় মাসের কারিগরি প্রশিক্ষণ শেষ করার পর ঝরে পড়া তরুণ-তরুণীদের হাতে শুধু সনদই নয়, সরাসরি তুলে দেওয়া হলো চাকরির চূড়ান্ত নিয়োগপত্র।
অষ্টম শ্রেণির পর নানা প্রতিকূলতায় শিক্ষার মূল স্রোত থেকে ছিটকে পড়া ৪৬ জন তরুণ-তরুণীর কর্মসংস্থান নিশ্চিত করে এই অনন্য নজির গড়েছে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন ও জেলা উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো।
বুধবার (১০ জুন) চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সম্মেলনকক্ষে ‘বিশেষ কার্যক্রম-কার্যকর সাক্ষরতা ও ব্যবহারিক কর্মদক্ষতা প্রশিক্ষণ (প্রাক্-বৃত্তিমূলক পর্যায়) কোর্সের সমাপনী ও জব লিংকেজ অনুষ্ঠানে এই নিয়োগপত্র বিতরণ করা হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন,
আমরা শুধু নামমাত্র প্রশিক্ষণ দিয়েই দায়িত্ব শেষ করতে চাই না, বরং প্রশিক্ষণের বাস্তব প্রতিফলন দেখতে চাই। একজন তরুণ যখন দক্ষতার সাথে কর্মসংস্থানের সুযোগ পায়, তখন শুধু তার একার জীবন বদলায় না বদলে যায় একটি পুরো পরিবার, একটি সমাজ।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, বাস্তবতার কারণে অনেকে পড়াশোনা থেকে ঝরে পড়লেও তাদের সম্ভাবনা শেষ হয়ে যায় না। সঠিক গাইডলাইন ও দক্ষতা পেলে এই তরুণরাই দেশের সবচেয়ে বড় শক্তিতে পরিণত হতে পারে।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর উদ্যোগে হাটহাজারী উপজেলার কাটিরহাট উচ্চবিদ্যালয় ও হাটহাজারী পার্বতী মডেল সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ে মোট চারটি ট্রেডে ৭৭ জনকে এই প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। চূড়ান্ত মূল্যায়নে ৭৩ জন সফলভাবে উত্তীর্ণ হন।
জেলা প্রশাসনের বিশেষ তৎপরতায় বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সাথে সমন্বয় করে কোর্স শেষের দিনই ৪৬ জনের চাকরি নিশ্চিত করা হয়েছে,টেইলারিং ও ড্রেস মেকিং: এই ট্রেডের ২০ জন নারী ও তরুণের সবাইকে ‘গ্রামীণ বুটিকস ও প্রোডাকশন হাউসে’ নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। শুরুতে ৫ হাজার টাকা বেতন ও ২ হাজার টাকা যাতায়াত ভাতা পাবেন তারা। তিন মাস পর চাকরি স্থায়ী হলে বেতন হবে ১০ হাজার টাকা।
এই বিভাগের ১৭ জনকে চট্টগ্রামের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে শিক্ষানবিশ হিসেবে যুক্ত করা হয়েছে, যেখানে তারা মাসিক ৫ হাজার টাকা ভাতা পাবেন। এই ট্রেডের ৯ জন তরুণ হাটহাজারীর বিভিন্ন সার্ভিসিং সেন্টারে ৫ থেকে ৮ হাজার টাকা বেতনে নিয়োগ পেয়েছে, এই ট্রেডের শিক্ষার্থীদের জন্যও দ্রুত কর্মসংস্থান তৈরির কাজ চলছে বলে প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে।
ডিসি জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, দেশে প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি তরুণ রয়েছে, যা বিশ্বের অনেক দেশের মোট জনসংখ্যার চেয়েও বেশি। এদের দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করতে পারলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি আরও মজবুত হবে। কোনো সৎ কাজই ছোট নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, আজ যারা প্রশিক্ষণ নিয়েছে, তারা আর ঝরে পড়া নয়; তারা এখন দক্ষ জনশক্তি।
চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে তরুণদের ন্যায্য মূল্যায়ন ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান ডিসি। একই সাথে তরুণদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, প্রথম বেতনের অঙ্ক বড় বিষয় নয়,
বড় বিষয় হলো দক্ষতা অর্জন। দক্ষতা বাড়লে আয় এবং সুযোগ দুটোই বাড়বে।
অনুষ্ঠানে জেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর প্রতিনিধি, চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি, প্রশিক্ষক ও প্রশিক্ষণার্থীরা উপস্থিত ছিলেন। সনদ ও নিয়োগপত্র হাতে পেয়ে উচ্ছ্বসিত তরুণ-তরুণীরা জানান, এই উদ্যোগ তাদের জীবনের অন্ধকার দূর করে নতুন আশার আলো দেখিয়েছে।