আব্দুল্লাহ আল মারুফ,বিনোদন প্রতিবেদক। মায়ের মুখে শেখা প্রথম গান দিয়ে যে যাত্রার সূচনা, তা আজ পরিণত হয়েছে দুই দশকের একনিষ্ঠ সঙ্গীতসাধনায়। তিনি রিয়া বড়ুয়া-আমাদের সঙ্গীত অঙ্গনের এক সুপরিচিত ও সম্ভাবনাময় কণ্ঠশিল্পী। দীর্ঘ ২১ বছর ধরে প্রফেশনালি গান গেয়ে জয় করে চলেছেন লাখো শ্রোতার মন। সম্প্রতি তাঁর নতুন ফোক ধাঁচের মৌলিক গান শিকল বেঁধে রাখলাম তোরে রাখতে পারি নাই” মুক্তি পাওয়ার পর শ্রোতামহলে নতুন করে আলোচনায় এসেছেন এই শিল্পী। বর্তমান মিউজিক ইন্ডাস্ট্রির নানা সংকট, প্রযুক্তির প্রভাব এবং নিজের সঙ্গীত জীবনের নানা চড়াই-উতরাই নিয়ে সম্প্রতি তিনি মুখোমুখি হয়েছিলেন এক একান্ত আলাপে।
নিজের সঙ্গীত জীবনের শুরুটা মনে করে রিয়া বড়ুয়া জানান, যখন তিনি দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়েন, তখন মায়ের শেখানো গান গেয়ে একটি প্রতিযোগিতায় প্রথম পুরস্কার পেয়েছিলেন। সেই থেকে শুরু। ৬ষ্ঠ শ্রেনীতে অধ্যয়নকালে কক্সবাজারের জনপ্রিয় সাংস্কৃতিক সংগঠন “হেমন্তিকার” সাধারণ সম্পাদক জনাব অনিল দত্তের হাত ধরে সংস্কৃতি অঙ্গনে যাত্রা শুরু করেন । পর্যায়ক্রমে মাত্র ১৫ বছর বয়স থেকে গানকে পেশা হিসেবে বেছে নেন তিনি। মায়ের পাশাপাশি তাঁর সঙ্গীত জীবনের আদর্শ বা অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছেন রুনা লায়লা, সাবিনা ইয়াসমিন, লতা মঙ্গেশকর, আশা ভোঁসলে, মিতালী মুখার্জী ও শ্রেয়া ঘোষালের মতো কিংবদন্তিরা।
সঙ্গীত জীবনে প্রথম হাতেকড়ি হয় প্রয়াত সঙ্গীতগুরু অনিল স্যারের হাতে, পরবর্তীতে চকরিয়ার বিশিষ্ট সঙ্গীত শিক্ষক দীপলাল চক্রবর্তী ও চট্টগ্রামের সুপরিচিত বিশিষ্ট গুণী সঙ্গীত শিক্ষক ফারুক আহমেদ এর কাছে দীর্ঘসময় সঙ্গীতের তালিম নিয়ে, শুদ্ধ সঙ্গীত চর্চার মাধ্যমে নিজেকে এগিয়ে নিচ্ছেন শিল্পী রিয়া বড়ুয়া । শিক্ষক ও ওস্তাদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে এই শিল্পী বলেন,ওস্তাদরা সবসময় বলতেন, গান শুধু কণ্ঠ থেকে নয়, অন্তর থেকে গাইতে হবে। একজন শিল্পীকে প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট কণ্ঠসাধনা করা বাধ্যতামূলক। আমি আজও সেই নিয়ম মেনে চলি এবং গানের ভাব অনুযায়ী নিজের সর্বোচ্চ আবেগ দিয়ে গাওয়ার চেষ্টা করি।
একটি গানের পেছনে সুর, লিরিক (কথা) নাকি গায়কি-কোনটি বেশি প্রধান? এমন প্রশ্নে রিয়ার উত্তর স্পষ্ট। তাঁর মতে, গীতিকার, সুরকার এবং শিল্পী-এই তিনের মেলবন্ধনেই একটি গান পূর্ণতা পায়। গান গাওয়ার আগে নিজেকে কল্পনার জগতে ডুবিয়ে দিয়ে লিরিক্সের ভাব ধারণ করার কৌশল বেছে নেন তিনি। তিনি মনে করেন, প্রতিটি গানই মানুষের জীবনের বাস্তব বা কল্পনার গল্প দিয়ে সাজানো, তাই গাওয়ার সময় মনে হয় প্রতিটি গানই যেন তাঁর নিজের জীবনের গল্প।
রেকর্ডিং স্টুডিওর চেয়ে সরাসরি লাইভ পারফর্ম্যান্স বা মঞ্চে গাইতেই বেশি ভালোবাসেন রিয়া। কারণ হিসেবে তিনি জানান, মঞ্চে দর্শকদের পছন্দের গান শুনিয়ে সরাসরি তাঁদের ভালোবাসা পাওয়া যায় এবং শ্রোতাদের সাথে মিশে যাওয়া যায়। মঞ্চের একটি অদ্ভুত ও স্মরণীয় অভিজ্ঞতার কথা শেয়ার করে তিনি বলেন,
একবার একটি ইসলামিক মানসিকতার পারিবারিক অনুষ্ঠানে গান গাইতে গিয়েছিলাম। সেই পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ হাজি সাহেব কোনোভাবেই গান মেনে নিতে পারছিলেন না। একপর্যায়ে তিনি এতটাই রেগে যান যে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন! ফলে সে রাতে আর গানই গাওয়া হলো না। পুরো টিম নিয়ে সারারাত বসে থেকে ভোরবেলা পেমেন্ট নিয়ে অস্বস্তিকর এক পরিস্থিতি মাথায় নিয়ে ফিরেছিলাম।
বর্তমান যুগে ইউটিউব, স্পোটিফাই বা সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে কাজের পরিধি বাড়লেও এর নেতিবাচক দিক নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন রিয়া বড়ুয়া। তিনি বলেন, এখন এআই (AI) বা বিভিন্ন অ্যাপসের মাধ্যমে চাইলেই যে কেউ গান করে রাতারাতি ভাইরাল হয়ে যাচ্ছে। এতে করে অনেক প্রতিভাবান মূল ধারার শিল্পী ও মিউজিশিয়ানরা পিছিয়ে পড়ছেন।
আজকাল বেশিরভাগ শ্রোতা গানের চেয়ে রঙ্গমঞ্চ খোঁজে বেশি। গানের চেয়ে শিল্পীর নাচ আর রূপে মুগ্ধ হতে চায়। শিল্পী বেড়েছে, কিন্তু গানের মান বা স্থায়িত্ব বাড়েনি। আগের দিনের গান যেভাবে হৃদয় স্পর্শ করত, এখনকার গান তা পারছে না। অনেক শিল্পী হঠাৎ ভাইরাল হয়ে আবার কিছুদিন পর বিলীন হয়ে যাচ্ছেন।
রিমেক বা ফিউশন প্রসঙ্গে তিনি মনে করেন, যুগের সাথে তাল মিলিয়ে নতুনত্ব প্রয়োজন হলেও পুরনো দিনের গানের আবেগ চির অমলিন। তাঁর ভাষায়-Old is gold always.
সঙ্গীতের পাশাপাশি রিয়া বড়ুয়া একজন পেশাজীবী (চাকরিজীবী)। কর্মব্যস্ততার মাঝেও তাঁর সবচেয়ে বড় শখ ও ইচ্ছে হলো-মৌলিক গানগুলোর মাধ্যমে শ্রোতাদের হৃদয়ে স্থায়ী জায়গা করে নেওয়া। জীবনের সবচেয়ে ভালোবাসার মানুষ হিসেবে তিনি তাঁর মায়ের নাম উচ্চারণ করেন।
শৈশবে কক্সবাজার জেলায় নজরুলগীতি ও দেশাত্মবোধক গানে প্রথম ও দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে বঙ্গবন্ধু জাতীয় শিশু-কিশোর প্রতিযোগিতায় ঢাকার মূল পর্বে যাওয়ার গৌরব অর্জন করেছিলেন তিনি। পরবর্তীতে বাংলাদেশ টেলিভিশনে (বিটিভি) অতিথি শিল্পী হিসেবেও গান পরিবেশন করেছেন। সম্প্রতি তাঁর নিজস্ব ইউটিউব চ্যানেল ‘Singer Riya Barua থেকে মুক্তি পাওয়া ফোক গানটি নিয়ে তিনি অত্যন্ত আশাবাদী এবং সামনে আরও বেশ কিছু মৌলিক গানের কাজ নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন। নতুনদের উদ্দেশ্যে তাঁর পরামর্শ-গানকে ভালোবেসে, রেওয়াজের মাধ্যমে কণ্ঠ সাধনা করে এগিয়ে যেতে হবে।
রিয়া বড়ুয়ার সঙ্গীতদর্শন এবং বর্তমান মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে তাঁর এই স্পষ্ট অবস্থানের প্রেক্ষিতে দেশের সঙ্গীত অঙ্গন ও শ্রোতামহলে নানামুখী প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে।বিশিষ্ট গীতিকার সঙ্গীত সমালোচক ও লোকসঙ্গীত গবেষক ড. আসাদুজ্জামান খান,আশরাফ আলী বলেন,রিয়া বড়ুয়া যে কথাটি বলেছেন তা বর্তমান সময়ের এক রূঢ় বাস্তব। প্রযুক্তির অপব্যবহারে গানের আত্মিক জায়গাটা নষ্ট হচ্ছে। তবে রিয়ার মতো যারা ওস্তাদের দীক্ষা নিয়ে প্রতিদিন রেওয়াজ করেন এবং গানকে অন্তর থেকে ধারণ করেন, তাদের স্থায়িত্ব সবসময়ই থাকবে। তাঁর নতুন গানটির সুর ও গায়কি অত্যন্ত চমৎকার, যা শ্রোতাদের দীর্ঘদিন মনে থাকবে।
জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী ও সুরকার মিজান রায়হান বলেন,মঞ্চ এবং স্টুডিওর পার্থক্যটা রিয়া খুব সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন। লাইভ শো-তে শ্রোতাদের যে তাৎক্ষণিক এনার্জি, সেটাই একজন প্রকৃত শিল্পীর আসল শক্তি। রিয়া বড়ুয়ার কণ্ঠের টেক্সচার ও আবেগ ঢেলে গাওয়ার ক্ষমতা প্রশংসনীয়। আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতে এখন তাঁর মতো একনিষ্ঠ সাধকের খুব প্রয়োজন।
রিয়া বড়ুয়ার নিয়মিত শ্রোতা ও সঙ্গীতানুরাগী ফাহমিদা সুলতানা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেছেন:
রিয়া আপুর ‘শিকল বেঁধে রাখলাম তোরে’ গানটি লুপে শুনছি। ওনার গায়কিতে একটা মাটির টান আছে। এই যুগে যেখানে সস্তা সঙ ও নাচ-গান দিয়ে ভাইরাল হওয়ার প্রতিযোগিতা চলে, সেখানে ওনার মতো একজন শিল্পী যখন বলেন ‘গান শুধু কণ্ঠ থেকে নয়, অন্তর থেকে গাইতে হবে-তখন সত্যি গান শোনার প্রতি আগ্রহ আরও বেড়ে যায়।
মায়ের আশীর্বাদ আর ওস্তাদের দেওয়া সুরের আলো বুকে নিয়ে রিয়া বড়ুয়া এগিয়ে চলবেন তাঁর স্বপ্নের ঠিকানায়-এমনটাই প্রত্যাশা দেশের সঙ্গীতপ্রেমী মানুষের।