আব্দুল্লাহ আল মারুফ।। চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার এওচিয়া ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সচিবের বিরুদ্ধে সরকারি নিয়মনীতি তোয়াক্কা না করে নিজস্ব উদ্যোগে হোল্ডিং ট্যাক্স (বাড়ির কর) আদায়ের বই ছাপিয়ে অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে ওয়ারিশ সনদ ও প্রত্যয়ন পত্রে অতিরিক্ত অর্থ আদায়েরও বিভিন্ন গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেছে। ইউনিয়ন পরিষদের অফিশিয়াল রেজিস্টারে এই আদায়কৃত অর্থ আদৌ এন্ট্রি (লিপিবদ্ধ) হচ্ছে কিনা, তা নিয়ে চরম ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করায় আদায়কৃত বিপুল পরিমাণ রাজস্বের বড় একটি অংশ বিভিন্ন খাতের নামে আত্মসাৎ বা লোপাট করা হচ্ছে।স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, যেকোনো ইউনিয়ন পরিষদের হোল্ডিং ট্যাক্স, ট্রেড লাইসেন্স বা অন্যান্য সেবামূলক খাতের রাজস্ব আদায়ের জন্য সরকারিভাবে নির্ধারিত ও অনুমোদিত রসিদ বা বই ব্যবহার করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু এওচিয়া ইউপি সচিব সরকারি সেই নিয়ম লঙ্ঘন করে ব্যক্তিগতভাবে বা নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় হোল্ডিং ট্যাক্স আদায়ের বই ছাপিয়েছেন।অভিযোগ রয়েছে, এই অননুমোদিত বইয়ের মাধ্যমে ইউনিয়নের সাধারণ নাগরিকদের কাছ থেকে ট্যাক্স আদায় করা হচ্ছে। নিয়ম অনুযায়ী আদায়কৃত অর্থ তাৎক্ষণিকভাবে সরকারি ক্যাশ বই বা সংশ্লিষ্ট রেজিস্টারে তোলার কথা থাকলেও, তা করা হচ্ছে না। ফলে এই অর্থ সরাসরি সরকারি কোষাগারে জমা না হয়ে ভিন্ন খাতে চলে যাচ্ছে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।ইউনিয়ন পরিষদে সেবা নিতে এসে চরম হয়রানি ও অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের শিকার হচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। এওচিয়া ইউনিয়নের ছনখোনা ১নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা আক্কাস উদ্দীন জানান: আমার ছোট ভাইকে ভোটার করার জন্য ইউনিয়ন পরিষদে নিয়ে যাই। তাৎক্ষণিক কাগজপত্রে স্বাক্ষর করার জন্য ইউপি সচিব আমার কাছ থেকে ১ হাজার টাকা দাবি করেন এবং তিনি কাজটির জন্য সেই টাকা আদায় করে নেন।একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান সেবাগ্রহীতা নুরুল কবির। তিনি বলেন, একটি ওয়ারিশ সনদের জন্য সচিবকে আমার ১ হাজার টাকা দিতে হয়েছে। এছাড়া ৭নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা আবু কালাম জানান, একটি চারিত্রিক বা নাগরিক প্রত্যয়ন পত্র গ্রহণের জন্য সচিবকে তার ৫০০ টাকা দিতে হয়েছে, যা সচিব নিজে চেয়ে নিয়েছেন।সংশ্লিষ্টদের মতে, স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন অনুযায়ী, রাজস্ব আদায়ের প্রতিটি পয়সার হিসাব সরকারি রেজিস্টারে থাকতে হয় এবং বছর শেষে তা অডিট (নিরীক্ষা) হওয়ার নিয়ম। নিজস্ব বই ব্যবহার করার কারণে আদায়কৃত অর্থের প্রকৃত পরিমাণ গোপন করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন রাজস্ব খাতের এই অর্থ রেজিস্টারে এন্ট্রি না করে আত্মসাৎ করা হচ্ছে কিনা, তা খতিয়ে দেখতে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।নিজস্ব বই ছাপিয়ে ট্যাক্স আদায় এবং রেজিস্টারে এন্ট্রি না করার বিষয়ে জানতে চাইলে এওচিয়া ইউনিয়ন পরিষদের সচিব তিলক কান্তি দাস অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন,রাজস্ব আদায়ের জন্য রশিদ বই চাপানোর জন্য আমাদের অফিসের স্টাফ হুমায়ূনকে প্রেস থেকে ছাফিয়ে আনার দায়িত্ব দি, সেই বই আমরা ব্যবহার করি,আমার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগটি সত্য নয়। সরকারি বই সংকটের কারণে সাময়িকভাবে বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। তবে সব অর্থই রেজিস্টারে লিপিবদ্ধ আছে, এখানে কোনো ধরনের অনিয়ম হয়নি।বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খোন্দকার মাহমুদুল হাসান বলেন, ইউনিয়ন পরিষদের রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে সরকারি রসিদ বই ছাড়া অন্য কিছু ব্যবহারের কোনো সুযোগ নেই। রেজিস্টার এন্ট্রি না করে অর্থ আত্মসাতের কোনো অভিযোগ বা প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট সচিবের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে।এ বিষয়ে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক (ডিসি) জাহিদুল ইসলাম মিয়া বলেন: সরকারি নিয়মনীতির বাইরে গিয়ে নিজস্ব রসিদ বই ছাপিয়ে ইউনিয়ন পরিষদের রাজস্ব আদায় করা সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তৃণমূলের সাধারণ মানুষকে সেবা দেওয়ার নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায় কিংবা সরকারি কোষাগারের টাকা লোপাট কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না। সাতকানিয়ার এওচিয়া ইউনিয়ন পরিষদের বিষয়টি আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখছি। দ্রুত তদন্ত কমিটি গঠন করে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। তদন্তে সত্যতা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ইউপি সচিবের বিরুদ্ধে সাময়িক বরখাস্তসহ বিভাগীয় ও আইনগত কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।