স্টাফ রিপোর্টার >>> রাজধানীর জলাবদ্ধতা ও মশা নির্মূলে সব রাজনৈতিক দল এবং নগরবাসীকে এগিয়ে আসতে হবে বলে জানিয়েছেন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আব্দুস সালাম। তিনি বলেন, রাজধানীর বর্তমান পরিস্থিতি পরিবর্তন করে একটি মানসম্মত ও বাসযোগ্য নগরী গড়ে তুলতে রাজনৈতিক ভেদাভেদ ভুলে জাতীয় ঐক্যের চিন্তা করতে হবে। একই সঙ্গে নাগরিকদেরও সমষ্টিগত উদ্যোগ নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। শনিবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে নগর উন্নয়ন সাংবাদিক ফোরাম, বাংলাদেশ আয়োজিত ‘ঢাকায় বৃষ্টি ভোগায় কেন? শীর্ষক নগর সংলাপে তিনি এ কথা বলেন।নগর সংলাপে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার এবং প্রকৌশলী-পরিকল্পনাবিদ মো. নুরুল্লাহ। সংগঠনের সভাপতি মতিন আব্দুল্লাহর সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক হাসান ইমনের সঞ্চালনায় আরও বক্তব্য রাখেন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) প্রেসিডেন্ট ড. আলী আফজাল, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সহ-সভাপতি শেখ মুহম্মদ মেহেদী আহসান, ঢাকা ওয়াসার সাবেক এমডি একেএম শহিদ উদ্দিন, বায়ুমণ্ডলী দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) চেয়ারম্যান আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার এবং স্থপতি খালিদ মাহমুদ শাহীন প্রমুখ।
বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমে প্রায়ই ঢাকাকে পৃথিবীর সবচেয়ে দূষিত, আবর্জনা ও দুর্গন্ধময় শহর এবং মশার নগরী হিসেবে আখ্যায়িত করা হয় উল্লেখ করে এসময় ডিএসসিসি প্রশাসক আব্দুস সালাম বলেন, তবে এই অবস্থা থেকে উত্তরণ সম্ভব। জনগণ যদি ৫০ শতাংশ এবং সরকার বা সিটি করপোরেশন যদি বাকি ৫০ শতাংশ দায়িত্ব পালন করে, তাহলে শতভাগ সফলতা অর্জন অসম্ভব নয়।
এ সময় প্রশাসক অতীতের উদাহরণ টেনে বলেন, ‘১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের মধ্যে দেশ এক মহাসংকট ও দুর্ভিক্ষের মুখোমুখি হয়েছিল। কিন্তু শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে দেশ দ্রুত সেই অবস্থা কাটিয়ে ওঠে। বর্তমানের জাতীয় সমস্যাগুলোর সঠিক নেতৃত্ব ও সমষ্টিগত ঐক্যের মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব।
প্রশাসক জানান, যথাযথ পদক্ষেপ নিলে মশা ৬৫ শতাংশ পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। তার দাবি, প্রায় ৯৯ শতাংশ মশার জন্ম হয় জলাবদ্ধতা থেকে। তাই জলাবদ্ধতা দূর করতে পারলে ডেঙ্গুর প্রকোপও কমানো সম্ভব হবে। তিনি বলেন, ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে প্রথমবারের মতো প্রাক-বর্ষা মশার লার্ভা নিধনে বিশেষ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এর আওতায় ৩৬ জন মাঠকর্মী প্রতিদিন প্রতিটি ওয়ার্ডে বাড়ি বাড়ি গিয়ে জরিপ চালাচ্ছেন। মোট ২ হাজার ২৫০টি বাড়ি থেকে লার্ভার নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো আগেভাগে চিহ্নিত করা হবে।নাগরিক অসচেতনতার উদাহরণ তুলে ধরে আব্দুস সালাম বলেন, ‘জরিপ শুরুর প্রথম দিন আমি নিজেই নগর ভবনের পাশের পশু হাসপাতালে যাই। সেখানে দুই দিন আগের বৃষ্টির পানি জমে থাকা একটি ভাঙা কৌটা ও পরিত্যক্ত পাতিলে অসংখ্য লার্ভা দেখতে পাই। লার্ভা ধ্বংস না করলে তা মশায় পরিণত হয়ে মানুষকেই আক্রান্ত করবে। অথচ ঘরের কোণে, ছাদবাগানে কিংবা ফ্রিজের জমে থাকা পানিতে মশা উৎপাদন হলেও দায় চাপানো হয় সিটি করপোরেশনের ওপর।’
জলাবদ্ধতা নিরসনে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার তাগিদ রাজধানীর জলাবদ্ধতার প্রধান কারণ হিসেবে অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং প্রাকৃতিক খাল-পুকুর ভরাটকে দায়ী করেন ডিএসসিসি প্রশাসক।ধোলাইখালের মতো ঐতিহ্যবাহী খালকে বক্স কালভার্টে রূপান্তরের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘পৃথিবীর বড় বড় শহরে উন্মুক্ত নদী বা প্রবাহিত খাল থাকে, যা বৃষ্টির পানি দ্রুত সরিয়ে নিতে সহায়তা করে। কিন্তু ঢাকায় কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। যেখানে অন্তত সাত থেকে আটটি প্রধান ড্রেনেজ চ্যানেল থাকা দরকার, সেখানে রয়েছে মাত্র দুটি বা তিনটি। তিনি আরও বলেন, নিউমার্কেট, ধানমন্ডি কিংবা এলিফ্যান্ট রোড এলাকার পানি পাম্প করে অন্য এলাকায় সরিয়ে দেওয়া কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। এসব পানি শেষ পর্যন্ত বুড়িগঙ্গা বা শীতলক্ষ্যায় নিয়ে যেতে হবে। এ বিষয়ে সরকারপ্রধানকে অবহিত করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর রাজধানীতে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও হকারের সংখ্যা বেড়েছে বলে মন্তব্য করেন আব্দুস সালাম। তিনি বলেন, নদীভাঙা বা কর্মহীন মানুষ ঢাকায় এসে কোনো লাইসেন্স বা ফি ছাড়াই রিকশা চালানো শুরু করছে। এভাবে একটি আন্তর্জাতিক মানের শহর পরিচালনা করা সম্ভব নয়। তিনি জানান, এখন থেকে রাজধানীতে কোনো হকার বা রিকশা নিবন্ধনের বাইরে থাকতে পারবে না। কোথায় কতজন হকার বসতে পারবেন, তারও সুনির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণ করা হবে। পাশাপাশি সাপ্তাহিক ছুটির দিনে ‘হলিডে মার্কেট’ চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে।
তবে এই শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার পথে কেউ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করলে তা বরদাশত করা হবে না বলেও সতর্ক করেন তিনি।
দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে ডিএসসিসি প্রশাসক বলেন, ‘গত জুলাইয়ের গণ-আন্দোলনের পর তিন মাস হলো নতুন সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। এখনই সরকারকে অকার্যকর করার চেষ্টা হলে দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। একটি সুস্থ গণতন্ত্রের জন্য সরকারকে সময় দিতে হবে।’
তিনি বলেন, অন্তত দুই থেকে তিন বছর সময় দিয়ে দেখতে হবে সরকার জনগণের মৌলিক সমস্যাগুলোর সমাধান করতে পারে কি না। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ভুলে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ ও ঢাকার শৃঙ্খলা ফেরাতে সব রাজনৈতিক দলকে ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
রিহ্যাবের সভাপতি ড. আলী আফজাল বলেন, ৫৪ বছর আগে ঢাকা শহরে প্রায় ৫০টি প্রাকৃতিক খাল ও লেক ছিল। এখন কতটি আছে, তা সবাই জানেন। একক কোনো সংস্থার পক্ষে জলাবদ্ধতা দূর করা সম্ভব নয়। এ জন্য সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
সমন্বয়হীনতার সমালোচনা করে তিনি বলেন, সারা বছরই ঢাকার বিভিন্ন সড়ক কখনো বিদ্যুৎ, কখনো গ্যাস, আবার কখনো পানির লাইনের জন্য খোঁড়া হচ্ছে। এতে ব্যয় বাড়ছে এবং জলাবদ্ধতাও সৃষ্টি হচ্ছে। পাশাপাশি এক শহরকে দুই সিটি করপোরেশনে ভাগ করাও ব্যবস্থাপনার বড় সমস্যা বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ভবিষ্যৎ জনসংখ্যার চাপ নিয়ে সতর্ক করে তিনি বলেন, ২০৫০ সালে ঢাকার জনসংখ্যা ৪ কোটিতে এবং ২১০০ সালে তা ৬ কোটিতে পৌঁছাতে পারে। তাই দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা প্রয়োজন।তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ কোনো আমেরিকা বা অস্ট্রেলিয়া নয়। ভবিষ্যতে জনসংখ্যা আরও বাড়বে। তাই এক ইঞ্চি আবাদি জমিও যেন নষ্ট না হয়, সে বিষয়ে এখন থেকেই পরিকল্পনা নিতে হবে। আবাসন, শিল্প ও বনায়নের জন্য নির্দিষ্ট অঞ্চল নির্ধারণ করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়ন জরুরি। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ববিদ ও মশা গবেষক অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার তার গবেষণাপত্রে বলেন, বেজমেন্ট ও পার্কিং এলাকায় জমে থাকা পানিতে ৬৪ শতাংশ মশার জন্ম হয়। তিনি বলেন, জলাবদ্ধতা ও মশার সমস্যা সমাধানে নগরবাসীকেও দায়িত্ব নিতে হবে। নিজ নিজ বাসা ও আঙিনা পরিষ্কার রাখার পাশাপাশি সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।গবেষণার তথ্য তুলে ধরে তিনি জানান, ঢাকা শহরের বাসাবাড়ির নিচতলা এবং খোলা জায়গায় জমে থাকা পানিতে মূলত দুটি প্রজাতির মশার বংশবৃদ্ধি ঘটে। তিনি বলেন, ‘ঢাকার মোট মশার প্রায় ৯৯ শতাংশই জলাবদ্ধতার সঙ্গে সম্পর্কিত। আমরা যদি জলাবদ্ধতা সমস্যার সমাধান করতে পারি, তাহলে মশার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে। বাকি অল্পসংখ্যক মশা বিভিন্ন পাত্রে জন্ম নেয়, যার মধ্যে এডিস মশাও রয়েছে।সেমিনারে গবেষণার একটি মাঠপর্যায়ের ভিডিও প্রদর্শন করা হয়। সেখানে দেখা যায়, পরীক্ষার জন্য মশারির ভেতরে রাখা একজন মানুষের চারপাশে বিপুলসংখ্যক মশা আক্রমণ করছে। মাত্র এক মিনিটে এসপিরেটর দিয়ে অসংখ্য মশা সংগ্রহ করা হয়। কবিরুল বাশার বলেন, ‘সম্প্রতি আমাদের একটি ফটোকার্ড ভাইরাল হয়েছিল, যেখানে বলা হয়েছিল ঢাকায় এক ঘণ্টায় একজন মানুষকে ৮৫০টি মশা কামড়াতে পারে। এই ভিডিও সেই দাবিরই প্রমাণ।
তিনি জানান, সংগৃহীত মশাগুলোর শরীরে ডেঙ্গু বা ম্যালেরিয়ার জীবাণু আছে কি না, তা পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, ‘কীটনাশক কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। আমরা যদি মশার জন্য শহরকে অনুকূল পরিবেশ হিসেবে রেখে দিই, তাহলে তারা বংশবিস্তার করবেই। তাই পরিবেশ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মশার বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। মশা নিয়ন্ত্রণে তিনি সমন্বিত মশক ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। পাশাপাশি ড্রেনে গাপ্পি মাছ ছাড়া এবং পরিবেশবান্ধব বিটিআই ব্যাকটেরিয়ার ব্যবহার বাড়ানোর পরামর্শ দেন।
জলাবদ্ধতা নিরসনের বিষয়ে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মো. নূরুল্লাহ। তার প্রস্তাবনায় বলা হয়, ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনার জন্য দ্রুত ড্রেনেজ সার্কেলের জনবল কাঠামো অনুমোদন করে কার্যক্রম চালু করতে হবে। ঢাকা ওয়াসার অবসরপ্রাপ্ত ড্রেনেজ বিশেষজ্ঞদের পরামর্শক হিসেবে সিটি করপোরেশনে যুক্ত করার প্রস্তাবও দেওয়া হয়।এ ছাড়া ঢাকা ওয়াসার বিদ্যমান স্টর্মওয়াটার ড্রেনেজ মাস্টার প্ল্যান অনুসরণ, সমন্বিত ড্রেনেজ মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন, দুই সিটি করপোরেশনের সমন্বয়ে বাস্তবায়ন কার্যক্রম পরিচালনা এবং ওয়ার্ড ও ব্লকভিত্তিক নাগরিক কমিটি গঠনের সুপারিশ করা হয়। প্রস্তাবে আরও বলা হয়, ড্রেনেজ ব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাগুলোকে নিয়ে স্টেকহোল্ডার কমিটি গঠন এবং টেকসই নগর পরিকল্পনার জন্য সরকারপ্রধানের সঙ্গে সমন্বিত আলোচনা জরুরি।