মো: আমজাদ হোসেন,গণমাধ্যমকর্মী >>> পবিত্র ঈদুল আজহা মুসলিম উম্মাহর অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব। আনন্দ, ত্যাগ, তাকওয়া ও মানবতার অপূর্ব সমন্বয়ে এ উৎসব মুসলিম জীবনে নিয়ে আসে আত্মশুদ্ধির অনন্য বার্তা। প্রতি বছর জিলহজ মাসের ১০ তারিখে বিশ্ব মুসলিম মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় পশু কোরবানির মাধ্যমে স্মরণ করে হজরত ইবরাহিম (আ.) ও হজরত ইসমাঈল (আ.)-এর অতুলনীয় আত্মত্যাগের ইতিহাস।ঈদুল আজহার মূল শিক্ষা নিহিত রয়েছে আত্মসমর্পণ ও ত্যাগের চেতনায়। আল্লাহর আদেশের সামনে নিজের সবচেয়ে প্রিয় জিনিসকেও বিসর্জন দেওয়ার যে বিরল দৃষ্টান্ত হজরত ইবরাহিম (আ.) স্থাপন করেছিলেন, তা কেয়ামত পর্যন্ত মানবজাতির জন্য অনুকরণীয় হয়ে থাকবে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর প্রাপ্ত প্রিয় পুত্র ইসমাঈল (আ.)-কে কোরবানি করার নির্দেশ পেয়ে তিনি বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেননি। অন্যদিকে ইসমাঈল (আ.)-ও আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের জীবন উৎসর্গে প্রস্তুত ছিলেন। পিতা-পুত্রের এই আত্মত্যাগ ও আনুগত্য ইসলামের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়।পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন, “আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না কোরবানির গোশত কিংবা রক্ত, বরং পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া।” (সুরা হজ : ৩৭)। এই আয়াত আমাদের স্পষ্টভাবে মনে করিয়ে দেয়, কোরবানির প্রকৃত উদ্দেশ্য বাহ্যিক আড়ম্বর নয়; বরং অন্তরের খোদাভীতি, নিষ্ঠা ও আত্মশুদ্ধি অর্জন।বর্তমান সমাজে কোরবানির চেয়ে অনেক সময় কোরবানির আয়োজনই বেশি আলোচনায় আসে। কে কত বড় পশু কিনলো, কার আয়োজন কত জাঁকজমকপূর্ণ—এসব বিষয় সামাজিক প্রতিযোগিতার অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ ইসলাম কখনো বাহ্যিক প্রদর্শনকে গুরুত্ব দেয়নি। ইসলামের শিক্ষা হলো সংযম, বিনয় ও মানবিকতা। কোরবানির প্রকৃত সৌন্দর্য নিহিত রয়েছে অসহায়, দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর মধ্যে।কোরবানির গোশত আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী ও গরিব মানুষের মাঝে বণ্টনের মাধ্যমে সমাজে ভ্রাতৃত্ববোধ, সহমর্মিতা ও সম্প্রীতির বন্ধন দৃঢ় হয়। ধনী-গরিবের ব্যবধান কমিয়ে পারস্পরিক সৌহার্দ্য বৃদ্ধিতেও কোরবানির গুরুত্ব অপরিসীম। ইসলাম চায়, ঈদের আনন্দ যেন সমাজের প্রতিটি মানুষের ঘরে পৌঁছে যায়।ঈদুল আজহা আমাদের আরও শিক্ষা দেয়—ত্যাগ ছাড়া কোনো মহৎ অর্জন সম্ভব নয়। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ কিংবা রাষ্ট্রীয় জীবনে সফলতা অর্জনের জন্য প্রয়োজন ধৈর্য, আত্মসংযম ও আত্মত্যাগের মানসিকতা। কোরবানি সেই মহান চেতনাকেই জাগ্রত করে।আজ যখন সমাজে স্বার্থপরতা, হিংসা ও ভোগবাদিতা ক্রমেই বেড়ে চলেছে, তখন ঈদুল আজহার ত্যাগের শিক্ষা আমাদের নতুন করে মানবিক হতে শেখায়। কোরবানি শুধু পশু জবাইয়ের আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং নিজের ভেতরের অহংকার, লোভ ও কুপ্রবৃত্তিকে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য বিসর্জন দেওয়ার নামই প্রকৃত কোরবানি।তাই আসুন, পবিত্র ঈদুল আজহার চেতনাকে ধারণ করে আমরা ত্যাগ, সহমর্মিতা ও মানবতার আদর্শে উজ্জীবিত হই। হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর আনুগত্য ও হজরত ইসমাঈল (আ.)-এর আত্মত্যাগের শিক্ষা আমাদের ব্যক্তি ও সমাজজীবনে প্রতিফলিত হোক। ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত হোক আমাদের জীবন, সমাজ ও মানবতা—এই হোক পবিত্র ঈদুল আজহার প্রকৃত আহ্বান।