আব্দুল্লাহ আল মারুফ বিনোদন প্রতিবেদক। নৃত্য ও সংগীতের এক অপূর্ব মেলবন্ধনে বর্তমান প্রজন্মের শ্রোতা-দর্শকদের মাঝে দারুণ সাড়া ফেলেছেন উদীয়মান কণ্ঠশিল্পী শিমলা আক্তার। সম্প্রতি বেশ কিছু মৌলিক গান এবং স্টুডিও লাইভ পারফরম্যান্সের মাধ্যমে তিনি প্রতিনিয়ত নজর কেড়ে চলেছেন। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের স্টেজ শোগুলোতেও এখন তার উপস্থিতি মানেই অন্যরকম এক উন্মাদনা। গানের সুরে শ্রোতাদের আপ্লুত করার পাশাপাশি নাচের মুদ্রায় দর্শক মাতানো-দুই মাধ্যমেই নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রাখছেন এই তরুণী।
২০০৩ সালের ১৫ অক্টোবর,নরসিংদী জেলার পলাশ থানা এলাকায় এক সাংস্কৃতিক আবহ ও সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম নেন শিমলা আক্তার। তার পিতা মাহবুব আলম এবং মাতা আমেনা বেগম। শৈশব থেকেই পরিবারের অনুপ্রেরণায় তাঁর সংস্কৃতির পথে হাঁটা।
সম্প্রতি এক একান্ত সাক্ষাৎকারে শিমলা তাঁর সংগীত জীবনের শুরুর গল্প বলতে গিয়ে বলেন:আমার সংগীত জীবনটি শুরু হয়েছিল মূলত নাচের ক্লাস থেকে। ছোটবেলা থেকেই আমি নাচ শিখতাম এবং পাশাপাশি গুনগুন করে গান গাইতাম। ক্লাসে নাচের অনুশীলনের সময় আমার নৃত্যগুরু আমার কণ্ঠ শুনে বলতেন, শিমলা, তুমি গান গেয়ে গেয়ে নাচের ক্লাসটি নাও তো।মূলত ওস্তাদজির অনুপ্রেরণাতেই আমার নৃত্যশিল্পী থেকে সংগীতশিল্পী হিসেবে রূপান্তরিত হওয়া। তিনি সবসময় বলতেন, আমার গলার কণ্ঠ অনেক সুন্দর ও শ্রুতিমধুর।
গানের প্রতি এই ভালোবাসার পেছনে আরেকটি বড় অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন তাঁর আপন বড় বোন। শিমলা জানান, তাঁর বোনও একজন সংগীতশিল্পী। ছোটবেলায় বোনের নিয়মিত রেওয়াজ শুনে শুনেই গানের প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ ও দুর্বলতা তৈরি হয়।
উপমহাদেশের প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী শ্রেয়া ঘোষাল, সাবিনা ইয়াসমিন, রুনা লায়লা এবং আশা ভোঁসলের মতো গুণী শিল্পীদের আদর্শ মেনে শুদ্ধ সংগীত চর্চার মাধ্যমে নিজেকে বিকশিত করতে চান শিমলা। গুরুজনদের কাছ থেকে পাওয়া শিক্ষা নিয়ে তিনি বলেন, আমার ওস্তাদ বা গুরুজিদের কাছ থেকে পাওয়া সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—ছোটদের স্নেহ করা আর বড়দের সম্মান করা। আমি সারা জীবন এই আদর্শ ধরে রাখতে চাই।
সংগীতে গীতিকার ও সুরকারের ভূমিকাকে সবচেয়ে এগিয়ে রাখেন এই শিল্পী। তাঁর মতে, গীতিকার তাঁর মেধা ও শ্রম দিয়ে গান লেখেন এবং সুরকার তাতে প্রাণ সঞ্চার করেন; আর শিল্পীর কাজ হলো সেই সৃষ্টিকে মানুষের সামনে বাস্তবে রূপদান করা। কোনো নতুন গান গাওয়ার আগে শিমলা গানটির ভাব, আবেগ ও তাৎপর্য বোঝার জন্য প্রতিনিয়ত অনুশীলনের মধ্যে থাকেন।
বর্তমান মিউজিক ইন্ডাস্ট্রির ‘ভাইরাল প্রবণতা’ নিয়ে বেশ স্পষ্ট ও পরিপক্ব মতামত প্রকাশ করেন শিমলা। তিনি বলেন,এখন সবাই সোশ্যাল মিডিয়া কেন্দ্রিক এবং ভাইরালমুখী হয়ে পড়েছে। এতে কাজের পরিধি বাড়লেও ভালো মানের গান ইন্ডাস্ট্রিতে আসছে না। একটা গান রিলিজ হওয়ার পর এক-দুই মাস মানুষের মুখে থাকে, তারপর উধাও হয়ে যায়। কিন্তু মেধা ও শ্রম দিয়ে তৈরি আগের গানগুলো অমর হয়ে আছে। আজকাল যে ফিউশন বা রিমিক্স গানগুলো হচ্ছে, সেগুলোও কিন্তু আগের গান থেকেই উৎপত্তি। এতেই প্রমাণ হয় আগের গানের সুর ও লিরিক্সের আবেদন কখনো ফুরাবার নয়। আমি চাই, সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোতে যেন আমরা ভাইরাল হওয়ার পেছনে না ছুটে শুদ্ধ সংগীত পৌঁছে দিতে পারি।
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে শিমলার গান প্রকাশের পর থেকেই শ্রোতাদের ইতিবাচক মন্তব্য চোখে পড়ার মতো। ফেসবুক ও ইউটিউবের মন্তব্যের ঘরে অনেক শ্রোতাই লিখেছেন, শিমলা আপু, আপনার এই মিষ্টি ও শ্রুতিমধুর কণ্ঠ দিয়ে আপনি বিশ্বমঞ্চের সর্বস্তরে পৌঁছে যেতে পারেন। তাঁর স্টুডিও লাইভ সেশনগুলোর ভিডিওর নিচে হাজারো দর্শক তাঁর গায়কী ও পরিবেশনার ভূয়সী প্রশংসা করছেন।
সম্প্রতি শিমলার একটি স্টেজ শো উপভোগ করা ঢাকার বেশ কয়েকজন নিয়মিত শ্রোতা জানান, শিমলার পারফরম্যান্সের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তিনি একই সাথে গান ও নাচের তালে পুরো মঞ্চ মাতিয়ে রাখতে পারেন। তাঁর শোতে কোনো একঘেয়েমি থাকে না। গান গাওয়ার সময় তাঁর এক্সপ্রেশন এবং কণ্ঠের পরিপক্বতা সত্যিই প্রশংসনীয়।
শিমলার এই পথচলা প্রসঙ্গে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির একজন জ্যেষ্ঠ সংগীত প্রশিক্ষক প্রয়াত গীতিকার আলাউদ্দিন আলীর স্ত্রী শিল্পী মিমি রাজকন্যা বলেন,শিমলা আক্তারের মূল শক্তি হলো তাঁর সুরের শুদ্ধতা এবং লয়-তালের ওপর চমৎকার নিয়ন্ত্রণ, যা তাঁর নাচের ব্যাকগ্রাউন্ডের কারণে আরও নিখুঁত হয়েছে। বর্তমান যুগে যেখানে সস্তা জনপ্রিয়তার একটা জোয়ার চলছে, সেখানে শিমলার মুখে শুদ্ধ সংগীত চর্চার কথা এবং গুরুমুখী বিদ্যার প্রতি এই সম্মান সত্যিই আশাব্যঞ্জক। সঠিক পৃষ্ঠপোষকতা পেলে তিনি দেশের সংগীতাঙ্গনে দীর্ঘস্থায়ী অবদান রাখতে পারবেন।
তরুণ এই শিল্পী ইতিমধ্যেই তাঁর গায়কীর স্বীকৃতিস্বরূপ প্রতি বছর একাধিক সম্মাননা ও ‘বর্ষসেরা অ্যাওয়ার্ড’-এ ভূষিত হয়েছেন। দেশের শীর্ষস্থানীয় স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেল-এটিএন বাংলা, জিটিভি, নেক্সাস টেলিভিশন এবং বাংলাদেশ টেলিভিশনসহ (বিটিভি) বিভিন্ন মাধ্যমে নিয়মিত গান পরিবেশন করে আসছেন তিনি।
সংগীতকেই নিজের জীবন-মরণ জ্ঞান করা এই শিল্পী অবসরের পুরোটা সময় ব্যয় করেন নিজেকে আরও উচ্চ স্তরে নিয়ে যাওয়ার অনুশীলনে। নতুন যারা এই মাধ্যমে আসতে চান, তাদের উদ্দেশ্যে শিমলার পরামর্শ-ভালো গায়ক হওয়ার আগে সর্বোপরি একজন ভালো মনের মানুষ হতে হবে।
খুব শীঘ্রই শিমলার নিজস্ব বেশ কিছু মিউজিক ভিডিও আসতে চলেছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য দুটি মৌলিক গান হলো ‘দুষ্টু লোকের দল’ এবং চুন সুপারি। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে শিমলা বলেন, আমি একজন ভালো মানের সংগীতশিল্পী হয়ে পৃথিবীর বুকে বাংলাদেশের শুদ্ধ সংগীতের চর্চাকে ছড়িয়ে দিতে চাই।