মোঃ দিদারুল ইসলাম, চট্টগ্রাম >>> চট্টগ্রাম নগরীতে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতিবিজড়িত গ্রাফিতি মুছে ফেলা নিয়ে টানা দুই দিন ধরে উত্তেজনা, রাজনৈতিক পাল্টাপাল্টি অবস্থান ও পুলিশের সঙ্গে ধস্তাধস্তির ঘটনায় উত্তপ্ত হয়ে ওঠে নগরী। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে শেষ পর্যন্ত নিজেই গ্রাফিতি আঁকতে নামেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন।সোমবার (১৮ মে) রাতে নগরীর টাইগারপাস এলাকায় ওয়াসিম ফ্লাইওভারের পিলারে নিজ হাতে গ্রাফিতি অঙ্কনের উদ্বোধন করেন মেয়র। এ সময় বিএনপি, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), চারুকলার শিক্ষার্থী, সাংস্কৃতিক কর্মীসহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতাকর্মীরা অংশ নেন। পরে রাতভর বিভিন্ন স্থানে নতুন করে গ্রাফিতি আঁকার কর্মসূচি চলে।এর আগে গ্রাফিতি মুছে ফেলার অভিযোগকে কেন্দ্র করে রোববার রাত থেকেই নগরীতে রাজনৈতিক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। অভিযোগ ওঠে, টাইগারপাস এলাকায় এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কয়েকটি পিলারে থাকা জুলাই আন্দোলনের গ্রাফিতির ওপর চসিকের পক্ষ থেকে হলুদ ও সাদা রঙ করা হয়েছে। এ ঘটনার প্রতিবাদে বিক্ষোভে নামে এনসিপির নেতাকর্মীরা।এনসিপির বিক্ষোভ থেকে মেয়র শাহাদাত হোসেনের বিরুদ্ধে বক্তব্য দেওয়ার প্রতিবাদে একই এলাকায় রাতেই মিছিল করেন ছাত্রদল ও বিএনপির নেতাকর্মীরা। একপর্যায়ে রাত ১১টার পর এনসিপির নেতাকর্মীরা টাইগারপাস এলাকায় এবং বিএনপি-ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা লালখান বাজার মোড়ে অবস্থান নিলে মুখোমুখি উত্তেজনা তৈরি হয়। পরে রাত ১২টার দিকে মেয়র শাহাদাত হোসেন ঘটনাস্থলে গিয়ে দলীয় নেতাকর্মী ও গণমাধ্যমকর্মীদের উদ্দেশে বক্তব্য দেন।পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সোমবার সকাল থেকে জিইসি মোড় থেকে দেওয়ানহাট পর্যন্ত মূল সড়ক ও আশপাশের এলাকায় সভা-সমাবেশ, মিছিল ও গণজমায়েত নিষিদ্ধ ঘোষণা করে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি)। পুলিশ কমিশনার হাসান মো. শওকত আলীর সই করা গণবিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, জনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা রক্ষায় চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ অধ্যাদেশ ১৯৭৮-এর ৩০ ধারা অনুযায়ী এ নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।এদিকে নিষেধাজ্ঞার মধ্যেই সোমবার দুপুরে টাইগারপাস এলাকায় কিছু শিক্ষার্থী গ্রাফিতি আঁকার উদ্যোগ নিলে পুলিশের সঙ্গে তাদের ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটে। বেলা পৌনে ১টার দিকে কয়েকজন শিক্ষার্থী সেখানে জড়ো হন। পরে তারা তিনজন করে গিয়ে গ্রাফিতি আঁকার কথা জানালেও পুলিশ বাধা দেয়।বেলা ২টার দিকে রং-তুলি নিয়ে দেয়ালে আঁকতে গেলে পুলিশ তাদের সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। এ সময় ধাক্কাধাক্কি ও উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। রঙের বালতি থেকে রঙ ছিটকে কয়েকজন পুলিশ সদস্য ও শিক্ষার্থীর গায়েও পড়ে। পরে পুলিশ কয়েকজনকে আটক করে ভ্যানে তোলে। তবে শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদের মুখে বেলা আড়াইটার দিকে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়।ঘটনার সময় এক নারী শিক্ষার্থীর সঙ্গে পুলিশের আচরণ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা শুরু হয়। বিষয়টি ঘিরে নগরজুড়ে আলোচনা সৃষ্টি হয়।চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের উপ-কমিশনার (উত্তর) আমিরুল ইসলাম বলেন, “মেট্রোপলিটন অধ্যাদেশের ৩০ ধারা জারি থাকার পরও ৫০-৬০ জন সেখানে জড়ো হয়েছিল। তাদের সরতে বলা হলেও তারা শোনেনি। সরিয়ে দিতে গেলে পুলিশের গায়ে রঙ মারে। কয়েকজনকে হেফাজতে নেওয়া হয়েছিল, পরে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।”সোমবার সকালে টাইগারপাস এলাকায় গ্রাফিতি আঁকার কর্মসূচি থাকলেও তা স্থগিত করা হয়। পরে দুপুরে অস্থায়ী নগর ভবনে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন মেয়র শাহাদাত হোসেন। সন্ধ্যার পর পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলে তিনি নিজে গ্রাফিতি অঙ্কনে অংশ নেন।মেয়রের উপস্থিতিতে চারুকলার শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা আবারও দেয়ালে জুলাই আন্দোলনের নানা প্রতীক, স্লোগান ও চিত্র অঙ্কন করেন। একই সময়ে নগরীর অন্য এলাকাতেও এনসিপি ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মীরা পৃথকভাবে গ্রাফিতি আঁকার কর্মসূচি পালন করেন।বর্তমানে নগরীর পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে বলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। তবে গ্রাফিতি মুছে ফেলা এবং তা পুনরায় আঁকাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে যে উত্তাপ তৈরি হয়েছে, তা এখনো চট্টগ্রামের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।