এনামুল হক রাশেদী, চট্টগ্রাম >>> নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডের কঠোর নজরদারিতে চট্টগ্রামের জলসীমায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে দস্যুতা ও চুরির ঘটনা। গত সাড়ে পাঁচ মাসে কোনো দস্যুতা বা চুরির অভিযোগ না থাকায় আন্তর্জাতিক সমুদ্র বাণিজ্যে আবারও আস্থা ফিরছে চট্টগ্রাম বন্দরকে ঘিরে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিরাপত্তা ঝুঁকি কমে যাওয়ায় জাহাজ পরিচালনা ব্যয় ও বীমা প্রিমিয়ামও হ্রাস পাচ্ছে।আন্তর্জাতিক সমুদ্র নিরাপত্তা সংস্থা রিজিয়নাল কো-অপারেশন অ্যাগ্রিমেন্ট অন কমবেটিং পাইরেসি অ্যান্ড আর্মড রবারি অ্যাগেইনস্ট শিপস ইন এশিয়া (রিক্যাপ)-এর সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দরে কোনো ধরনের দস্যুতা বা চুরির ঘটনা ঘটেনি।কোস্টগার্ড সূত্র জানায়, গত দেড় বছরে পরিচালিত ১ হাজার ৩২০টি অভিযানের মাধ্যমে ৪৭টি মার্চেন্ট জাহাজে দস্যুতার চেষ্টা প্রতিরোধ করা হয়েছে। একই সঙ্গে উদ্ধার করা হয়েছে চুরি হওয়া পাঁচটি জাহাজের মালামাল।অন্যদিকে, ভারতের বিভিন্ন বন্দরে গত কয়েক বছর ধরে বিচ্ছিন্নভাবে চুরি ও দস্যুতার ঘটনা ঘটছে। ২০২৩ সালে একটি ঘটনা রেকর্ড হলেও ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় সাতটিতে। ২০২৫ সালেও সেখানে একাধিক ঘটনা ঘটেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়প্রতিবেদনে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সমুদ্রপথকে এখনো ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষ করে ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপিন্স অঞ্চলে নিয়মিত দস্যুতা ও সশস্ত্র চুরির ঘটনা ঘটছে। ২০২৪ সালের প্রথম তিন মাসেই ইন্দোনেশিয়ায় পাঁচটি দস্যুতার ঘটনা রেকর্ড করা হয়। একইভাবে ২০২৬ সালের শুরুর দিকে ফিলিপিন্সের জলসীমায় অন্তত ছয়টি সশস্ত্র হামলা ও দস্যুতার তথ্য পেয়েছে রিক্যাপ।নৌবিশেষজ্ঞদের মতে, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ও বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি এবং যৌথ টহল কার্যক্রমের কারণেই এই ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। আধুনিক রাডার প্রযুক্তি ব্যবহার, দ্রুত টহল ও নজরদারি বৃদ্ধির ফলে বিদেশি জাহাজগুলো এখন চট্টগ্রাম বন্দরে আগের তুলনায় বেশি নিরাপত্তা অনুভব করছে।কর্ণফুলী নদীর মোহনা হয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের আলফা, ব্রেভো ও চার্লি অ্যাংকারেজ এলাকায় নিয়মিত টহল দিচ্ছে নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডের মেটাল শার্ক বোট। এর ফলে আমদানি-রফতানিমুখী দেশি-বিদেশি জাহাজ চলাচলেও ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে।বাংলাদেশ শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের ভাইস চেয়ারম্যান মশিউল আলম স্বপন বলেন, “কোনো বন্দরে দস্যুতা ও চুরির ঘটনা কমে গেলে আন্তর্জাতিক বীমা প্রিমিয়াম হ্রাস পায় এবং জাহাজ পরিচালনা ব্যয়ও কমে আসে।” তিনি বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের এই নিরাপত্তা পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদে বজায় থাকলে বিদেশি বিনিয়োগ ও কার্গো হ্যান্ডলিং আরও বাড়বে।চট্টগ্রাম বন্দরের সদস্য (হারবার অ্যান্ড মেরিন) কমোডর আহমেদ আমিন আব্দুল্লাহ বলেন, “সাগরে আগের চেয়ে কঠোর নজরদারি ও কৌশলগত পরিবর্তন আনা হয়েছে। তিন বাহিনীর সমন্বিত অভিযান ও নিয়মিত টহলের কারণেই জলদস্যুরা দস্যুতার সুযোগ পাচ্ছে না।”চট্টগ্রাম বন্দরের হিসাবে, গেল বছর বহির্নোঙরে আসা বা অবস্থান করা দেশি-বিদেশি জাহাজে দস্যুতার চারটি ঘটনা ঘটে।চট্টগ্রাম বন্দর সচিব সৈয়দ রেফাত হামিম বলেন, “নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড ও বন্দর কর্তৃপক্ষের সময়োপযোগী ও সমন্বিত পদক্ষেপের কারণে বহির্নোঙরে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে। এ সমন্বিত প্রচেষ্টার ফলে বহির্নোঙর এলাকা আগের চেয়ে অনেক বেশি নিরাপদ।তিনি আরও বলেন, “রিক্যাপের তথ্য অনুযায়ী দস্যুতার দিক থেকে এ অঞ্চলের বন্দরগুলোর মধ্যে আমরা ভালো অবস্থানে আছি। সময়োপযোগী বিভিন্ন পদক্ষেপের কারণে এ অর্জন সম্ভব হয়েছে। আমরা এ অর্জন ধরে রাখতে চাই।”তার ভাষ্য, “আন্তর্জাতিক শিপিং লাইনগুলোর মধ্যে আস্থা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বন্দরের ভাবমূর্তি ও সুনাম বহুগুণ বেড়েছে।”চট্টগ্রাম বন্দরে প্রতি বছর গড়ে চার হাজারের বেশি দেশি-বিদেশি জাহাজ পণ্য নিয়ে আসে এবং বহির্নোঙরে অবস্থান করে।