অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা আ. ফ. ম. খালেদ হোসেন।। পাঞ্জাব সরকারের ব্যবস্থাপনায় লাহোরের সেই পাঁচ তারকা হোটেলের আভিজাত্যমাখা অভ্যর্থনা ছিল আমাদের দীর্ঘ সফরের সার্থক উপহার। সরকারি কর্মকর্তাদের আন্তরিক আপ্যায়ন শেষে যখন রুমে ফিরলাম, দুচোখে তখন রাজ্যের ক্লান্তি। সেই ক্লান্তি কাটিয়ে ভোরের আলো ফুটতেই আমাদের যাত্রা শুরু হলো লাহোরের রায়ভেন্ড রোডের দিকে। লক্ষ্য— পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মিয়া নওয়াজ শরিফ ও পাঞ্জাবের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মুহতরমা মরিয়ম নওয়াজের পৈতৃক বাসভবন, যা ‘যাতি উমরা’ নামে এক সুরক্ষিত স্বর্গরাজ্য হিসেবে পরিচিত।
যাতি উমরার সবুজ ক্যানভাস
গাড়ি যখন যাতি উমরায় প্রবেশ করল, চোখের সামনে ভেসে উঠল শত শত একর জুড়ে বিস্তৃত সবুজ ঘাসের গালিচা। কয়েকশ একরের এই বিশাল কমপ্লেক্সে শরিফ পরিবারের সদস্যদের একেকটি অট্টালিকা যেন একেকটি আধুনিক রাজপ্রাসাদ। প্রবেশপথের দু’ধারে সারি সারি ফলের বাগানগুলো এক মোহনীয় দৃশ্যের অবতারণা করে। সেখানে মালিদের একাগ্র চিত্তে বাগানের পরিচর্যা করার দৃশ্যটি বুঝিয়ে দেয়, আভিজাত্যের সাথে প্রকৃতির এখানে কত গভীর সখ্য।
উষ্ণ অভ্যর্থনা ও ঢাকা-স্মৃতি।
বাসভবনে পৌঁছানোর সাথে সাথে মিয়া সাহেব ও মরিয়ম নওয়াজ পরম মমতায় আমাদের বরণ করে নিলেন। ড্রয়িং রুমে বসার পর আলাপচারিতার শুরুতেই তারা বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে গভীর আগ্রহ প্রকাশ করেন। আলাপের এক পর্যায়ে নওয়াজ শরিফ ফিরে গেলেন অতীতের ধূসর পাতায়। আবেগমিশ্রিত কণ্ঠে স্মৃতিচারণ করলেন ঢাকার তেজগাঁওয়ে তাঁর বাবা মরহুম মুহাম্মদ শরিফের সেই লোহা তৈরির কারখানার কথা। দু’বার বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় সফরের সেই রঙিন মুহূর্তগুলো যেন তাঁর চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে উঠল।
কিছুদিন আগে আমার ছোটভাই মাওলানা জাহিদ হোসেনের মাধ্যমে তাঁর জন্য পাঠানো কিছু বাংলাদেশী ফলের প্রসঙ্গ তুলতেই তিনি বারবার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলেন। সেই কৃতজ্ঞতায় সৌজন্যের চেয়ে আন্তরিকতাই ছিল বেশি।
পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী মরিয়ম নওয়াজ কেবল একজন রাজনীতিক নন, বরং একজন সচেতন দূরদর্শী ব্যক্তিত্ব হিসেবে বাংলাদেশের অর্থনীতি, বাণিজ্য এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের খোঁজখবর নিলেন। আমি যখন বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের জন্য পাঞ্জাবের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে স্কলারশিপ বা বৃত্তির আবেদন জানালাম, তখন তাঁর ইতিবাচক সাড়া আমাদের আশান্বিত করেছে। উপহার হিসেবে আমার পক্ষ থেকে ছিল বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী উন্নত সিরামিকের কারুকাজ করা টি সেট। তাঁরাও অত্যন্ত সম্মানের সাথে পাল্টা উপহারে আমাদের ভূষিত করলেন।
পৈতৃক ভিটায় প্রার্থনার মুহূর্ত।
আলাপ শেষে মিয়া সাহেবের সাথে আমরা তাঁদের পৈতৃক কবরস্থানে গমন করি। সেখানে শায়িত পূর্বপুরুষদের আত্মার মাগফিরাত এবং আল্লাহর রহমত কামনা করে মোনাজাত করি। সেই নীরব মুহূর্তগুলো ছিল বেশ গাম্ভীর্যপূর্ণ ও আধ্যাত্মিকতায় ঘেরা।
”বাবা ও মেয়ের মার্জিত আচরণ এবং অতুলনীয় আতিথেয়তা কেবল আমাদের মুগ্ধ করেনি, বরং লাহোরের এই সফরকে আমাদের স্মৃতির মণিকোঠায় এক অমলিন স্থান করে দিয়েছে।