আব্দুল্লাহ্ আল মারুফ।। চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার কেঁওচিয়া বন গবেষণা কেন্দ্রে (BFRI) প্রশাসনিক স্থবিরতা এবং সরকারি বনভূমি অবাধে বেদখল হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। দীর্ঘদিনের অনুপস্থিতির পর অবশেষে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছেে আজ স্টেশনে দেখা মিলেছে বিতর্কিত স্টেশন অফিসার আনিসুর রহমানের। তবে তার উপস্থিতিতেই বেরিয়ে এসেছে এক ভয়াবহ চিত্র-কেন্দ্রের ১ হাজার ৮৪ একর সংরক্ষিত বনভূমির অর্ধেকেরও বেশি এখন প্রভাবশালী ভূমিদস্যুদের দখলে।
দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ ছিল, স্টেশন অফিসার আনিসুর রহমান কর্মস্থলে নিয়মিত উপস্থিত থাকেন না। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কেন্দ্রের একাধিক কর্মচারী জানান,স্যারকে অফিসে পাওয়া দুষ্কর। তিনি মাসে দু-একবার আসেন কি না সন্দেহ। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে তিনি আড়ালে থাকেন, যার ফলে দাপ্তরিক ও মাঠ পর্যায়ের কাজে আমাদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়।
সোমবার (২০ এপ্রিল)সরজমিনে তদন্তে গিয়ে দেখা যায়, দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পরেও অফিসে তার দেখা মিলেনি,অনুপস্থিতির বিষয়ে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। তবে তার দপ্তরে প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলার ছাপ ছিল স্পষ্ট।
অফিসে উপস্থিত হয়ে স্টেশন অফিসার আনিসুর রহমান নিজেই স্বীকার করেন যে, কেন্দ্রের আওতাধীন সংরক্ষিত বনভূমি চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। তিনি তথ্য দেন, কেন্দ্রের মোট ১,০৮৪ একর সংরক্ষিত বনভূমির মধ্যে বর্তমানে মাত্র ৫০০ একর তাদের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে আছে। বাকি ৫৮৪ একর ভূমিই বিভিন্নভাবে বেদখল হয়ে গেছে।
বিশাল এই সরকারি সম্পদ কীভাবে প্রভাবশালীদের কবলে চলে গেল, সে বিষয়ে তিনি কোনো সুনির্দিষ্ট আইনি বা কার্যকর পদক্ষেপের কথা জানাতে পারেননি। বনভূমির এই বেদখল প্রক্রিয়ায় স্থানীয় প্রভাবশালী ও ভূমিদস্যুদের সিন্ডিকেট সক্রিয় বলে জানা গেছে।
নিজের অনিয়মিত উপস্থিতির বিষয়ে গণমাধ্যমকর্মীরা সরাসরি অফিসে গেলে সেখানে তালা ঝুলতে দেখা যায়। পরবর্তীতে স্টেশন অফিসার আনিসুর রহমান সরাসরি বক্তব্য দিতে রাজি না হলেও মুঠোফোনে জানান, মাঠ পর্যায়ের দাপ্তরিক ব্যস্ততার কারণে তিনি নিয়মিত অফিসে বসতে পারেন না। জনবল সংকটের অজুহাত দেখিয়ে তিনি আরও বলেন, সীমাবদ্ধতার মধ্যেও তারা বেদখল হওয়া ভূমি উদ্ধারে কাজ করে যাচ্ছেন।
তবে স্থানীয় সিনিয়র গণমাধ্যমকর্মী
মোহাম্মদ বেলাল হোছাইন’র দাবি ভিন্ন,
স্টেশন অফিসারের কার্যালয়ের অনতিদূরে বিএফআরআই’র জায়গায় জনৈক ছিদ্দিকের নেতৃত্বে গড়ে ওঠেছে বিশাল রোহিঙ্গা পল্লী। সেখানে নিয়মিত মাদকের হাট বসে। তারা সেখানে বিশাল পাকা দালানসহ বিভিন্ন স্থাপনা গড়ে তুলেছে। রয়েছে বিদ্যুৎ সংযোগ।
তিনি আরও বলেন, স্টেশন অফিসার নিজের ইচ্ছামতো অফিস করেন। বন রক্ষা বা দখলদারদের বিষয়ে তার কোনো মাথাব্যথা নেই। মূলত উনার চরম অবহেলা ও উদাসীনতার কারণেই ৫৮৪ একর বনভূমি হাতছাড়া হয়েছে। অবিলম্বে উনাকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা প্রয়োজন।
স্থানীয় ব্যবসায়ী নুরুল ইসলাম জানান,
স্টেশন মাস্টারের সাথে যারা সরকারি জমি বাগান সম্পদ দখল করছে তাদের সাথে টাকার বিনিময়ে রাফা দফা হয়েছে, যার কারণে স্টেশন মাস্টার তাদের বিরুদ্ধে উল্লেখযোগ্য কোন অভিযান বা একশানে যেতে পারেনি,আমি সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে, এ বিষয়ে গভীর তদন্ত সাপেক্ষে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান করছি।
এ বিষয়ে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে বিএফআরআই (BFRI)-এর বর্তমান পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) যুগ্ম সচিব মোহাম্মদ তারিফুল বারী জানান, স্টেশন অফিসারের অনুপস্থিতির বিষয়ে,ইতোমধ্যে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ভূমি দখলের বিষয়টি আমরা শুনেছি এবং রিপোর্ট পেয়েছি। এটি পুনরুদ্ধারে আমরা জেলা প্রশাসনের সাথে যোগাযোগ করছি। বন বিভাগের সহযোগিতায় স্থানীয় সাংবাদিকদের সাথে নিয়ে আমরা দ্রুত উচ্ছেদ অভিযানে নামব। পুরো দেশে ভূমি দখল একটি সমস্যা হলেও, আমরা এটি উদ্ধারে কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছি। এত বিশাল পরিমাণ জমি বেদখল হওয়ার দায় তিনি সামষ্টিক ব্যর্থতা হিসেবে উল্লেখ করেন।
বন আইন ১৯২৭ (সংশোধিত ২০০০) অনুযায়ী, সংরক্ষিত বনভূমি দখল বা সেখানে কোনো স্থাপনা নির্মাণ করা দণ্ডনীয় অপরাধ। এছাড়া সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী, যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকা অসদাচরণ হিসেবে গণ্য।
পরিবেশবাদী ও স্থানীয় সচেতন মহলের আশঙ্কা, দ্রুত এই ৫৮৪ একর জমি উদ্ধার করা না গেলে অবশিষ্ট ৫০০ একর ভূমিও অচিরেই ভূমিদস্যুদের পেটে চলে যাবে। সরকারি সম্পদ রক্ষায় এবং প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ফেরাতে তারা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।