বিএসপি আন্তর্জাতিক ডেস্ক >>> মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত থামাতে সম্ভাব্য শান্তি আলোচনায় চীনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা সামনে এসেছে। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় হতে যাওয়া ইসলামাবাদ সংলাপে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্ভাব্য চুক্তির ‘গ্যারান্টার’ বা জামিনদার হিসেবে বেইজিংয়ের নাম আলোচনায় এসেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট সরকারি সূত্র ও বিশেষজ্ঞরা।সূত্রগুলোর ভাষ্য, যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা গত মঙ্গলবার রাতে প্রায় ভেস্তে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। সেই সময় পর্দার আড়ালে হস্তক্ষেপ করে ইরানকে একটি প্রাথমিক যুদ্ধবিরতিতে রাজি করাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে চীন।এক মাসের বেশি সময় ধরে চলা সংঘাতের স্থায়ী অবসান নিয়ে আলোচনার জন্য তেহরান ও ওয়াশিংটনের কর্মকর্তারা শিগগিরই ইসলামাবাদে বৈঠকে বসবেন। সব ঠিক থাকলে সেখানে একটি পূর্ণাঙ্গ শান্তি চুক্তির ভিত্তি তৈরি হতে পারে।ইসলামাবাদের একজন জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তা এএফপিকে বলেন, “মঙ্গলবার রাতে যুদ্ধবিরতির আশা প্রায় শেষ হয়ে গিয়েছিল। তখন চীন হস্তক্ষেপ করে ইরানকে প্রাথমিক যুদ্ধবিরতিতে রাজি করায়।”তিনি জানান, পাকিস্তান এই প্রচেষ্টায় মুখ্য ভূমিকা পালন করলেও শেষ পর্যন্ত সমঝোতা নিশ্চিত করতে পারছিল না। পরে বেইজিং ইরানকে বোঝাতে সক্ষম হয়।চীনের ভূমিকার বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল হওয়ায় সংশ্লিষ্ট অনেকেই নাম প্রকাশ করতে চাননি। তবে যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এএফপিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, ইরানকে আলোচনার টেবিলে আনতে চীন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি স্থায়ী চুক্তি করতে হলে কয়েকটি জটিল বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছাতে হবে। এর মধ্যে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত রাখা এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পর্কিত বিষয় রয়েছে।সংলাপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি কূটনৈতিক সূত্র জানায়, নৌ-চলাচল, পারমাণবিক কর্মসূচি এবং অন্যান্য কৌশলগত বিষয়ে আলোচনা এগিয়ে নিতে পাকিস্তান একটি বিশেষজ্ঞ দল গঠন করেছে। তবে এখন সবার নজর চীনের সম্ভাব্য ভূমিকার দিকে।আরেকটি সূত্রের দাবি, সম্ভাব্য শান্তি চুক্তির গ্যারান্টার হিসেবে চীনকে অনুরোধ করা হয়েছে। কারণ ইরান একটি শক্তিশালী গ্যারান্টার চায়। প্রধান বিকল্প হিসেবে রাশিয়ার নাম আসতে পারত, তবে ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে পশ্চিমা দেশগুলোর কাছে মস্কোর গ্রহণযোগ্যতা কমে গেছে। ফলে চীনই সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।তবে বেইজিং আনুষ্ঠানিকভাবে গ্যারান্টারের ভূমিকা নেবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। একটি সূত্র বলেছে, চীন প্রকাশ্যে সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে অনাগ্রহী হলেও পর্দার আড়ালে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে আগ্রহী।ইসলামাবাদ ও তেহরানের সঙ্গে বেইজিংয়ের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও চীন ইরানের অন্যতম বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার। অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট শী জিনপিং এর বেল্ট এন্ড রোড(বিআর) প্রকল্পের অংশ হিসেবে পাকিস্তানে কয়েক বিলিয়ন ডলারের অবকাঠামো বিনিয়োগ করেছে চীন। দুই দেশ প্রায়ই নিজেদের সম্পর্ককে ‘অভেদ্য ভ্রাতৃত্ব’ বলে উল্লেখ করে।পাকিস্তানের পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষের প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির চেয়ারম্যান মুশাহিদ হোছাইন সাঈদ বলেন, “ঘনিষ্ঠ অংশীদার ও প্রতিবেশী হিসেবে যুদ্ধের শুরু থেকেই পাকিস্তান ও চীন নিবিড়ভাবে সমন্বয় করে কাজ করছে।”তিনি আরও বলেন, যেহেতু ইরান মার্কিন নেতৃত্বকে পুরোপুরি বিশ্বাস করে না, তাই একটি চূড়ান্ত শান্তি চুক্তিতে পৌঁছাতে চীনের মতো শক্তিশালী গ্যারান্টারের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।গত মাসে সৌদি আরব, তুরস্ক ও মিশরের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে আলোচনা করে পাকিস্তান। এরপর দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইছহাক দ্বার বেইজিং সফর করেন। তখন চীন পাকিস্তানের মধ্যস্থতার প্রচেষ্টাকে সমর্থনের কথা জানায়।যুদ্ধবিরতি ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা আগে চীন ও রাশিয়া জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়ার বিষয়ে একটি প্রস্তাবে ভেটো দেয়। যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত ওই প্রস্তাবটি উত্থাপন করেছিল বাহরাইন।কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, শান্তি আলোচনার পথ মোটেও সহজ নয়। বিবাদমান পক্ষগুলোর অবস্থানের মধ্যে বড় ব্যবধান রয়েছে। বিশেষ করে লেবাননকে যুদ্ধবিরতির অংশ করার প্রশ্নে মতভেদ তৈরি হয়েছে। পাকিস্তান ও ইরান লেবাননকে অন্তর্ভুক্ত করতে চাইছে, তবে ইসরায়েল তাতে আপত্তি জানিয়েছে।এদিকে যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, আগামী সপ্তাহে ওয়াশিংটনে ইসরায়েলি ও লেবানিজ কর্মকর্তাদের মধ্যে পৃথক আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া হবে।ইসলামাবাদের এক কূটনৈতিক সূত্রের ভাষ্য, এই আলোচনা অত্যন্ত জটিল ও সংবেদনশীল। চূড়ান্ত ঐকমত্যে পৌঁছাতে হলে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকেই কিছু কঠিন বিষয়ে আপস করতে হবে।
সূত্রঃ এএফপি।