রিপোর্ট আব্দুল্লাহ আল মারুফ।। বিশ্বজুড়ে চলমান সামরিক উত্তেজনা যদি দ্রুত প্রশমিত না হয়ে দীর্ঘায়িত হয়, তবে এর আঁচ সরাসরি এসে পড়বে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের রান্নাঘর থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পর্যন্ত। অর্থনৈতিক বিশ্লেষক এবং জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে বাংলাদেশ মূলত পাঁচটি প্রধান সংকটের সম্মুখীন হবে।
জ্বালানি নিরাপত্তা ও লোডশেডিং
বাংলাদেশের জ্বালানি তেলের প্রায় ৯০ শতাংশ এবং এলএনজির (LNG) একটি বড় অংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এবং হরমোজ প্রণালীর মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলো অবরুদ্ধ হলে:সরবরাহ বিঘ্ন: তেল ও গ্যাসবাহী জাহাজ আসা বন্ধ বা সীমিত হয়ে যেতে পারে। জ্বালানি সংকটে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে, যার ফলে শিল্পোৎপাদন মারাত্মক ব্যাহত হবে।
আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি $১৩০ ডলারে পৌঁছাতে পারে, যা বাংলাদেশের আমদানিব্যয় বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। লাগামহীন মূল্যস্ফীতি ও খাদ্য সংকট যুদ্ধ মানেই সরবরাহ চেইন (Supply Chain) ছিন্ন হওয়া। এর ফলে:
ভোজ্য তেল, গম এবং ডালের মতো আমদানিনির্ভর পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যেতে পারে।
জ্বালানির দাম বাড়লে বাস, ট্রাক ও নৌযানের ভাড়া বাড়বে, যা পরোক্ষভাবে প্রতিটি পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেবে। বর্তমানে থাকা ৮.৫% মূল্যস্ফীতি দ্বিগুণ হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিতে পারে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম স্তম্ভ হলো মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত কয়েক লাখ প্রবাসী শ্রমিক। যুদ্ধ কবলিত দেশগুলো থেকে শ্রমিকদের ফিরিয়ে আনতে হলে রেমিট্যান্স প্রবাহ হঠাৎ কমে যাবে।
ইতোমধ্যে দুবাই, বাহরাইন ও কুয়েতে প্রবাসী বাংলাদেশিরা যুদ্ধ পরিস্থিতিতে হতাহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। যুদ্ধ দীর্ঘ হলে এই ঝুঁকি আরও বাড়বে।
রপ্তানি বাণিজ্য ও পোশাক খাত
বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাকের বড় বাজার ইউরোপ ও আমেরিকা।শিপিং চার্জ: লোহিত সাগরে অস্থিরতার কারণে জাহাজগুলোকে দীর্ঘ পথ (কেপ অব গুড হোপ) ঘুরে যেতে হচ্ছে। এতে ফ্রেইট চার্জ বা জাহাজ ভাড়া কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। উৎপাদন খরচ বাড়লে এবং সময়মতো পণ্য পৌঁছাতে না পারলে বিদেশি ক্রেতারা বিকল্প বাজারের দিকে ঝুঁকতে পারে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের পথ সংকুচিত করবে।
আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং রেমিট্যান্স কমে যাওয়ার ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডলার রিজার্ভে প্রচণ্ড চাপ পড়বে। এতে টাকার মান আরও কমবে এবং ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হার অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (CPD) মতে, “যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে বাংলাদেশকে ‘ফোর্সড অস্টেরিটি’ বা বাধ্যতামূলক কৃচ্ছ্রসাধনের পথে হাঁটতে হবে। বিলাসদ্রব্য আমদানি পুরোপুরি বন্ধ করে কেবল খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তায় মনোযোগ দিতে হবে।”
পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারকে এখনই কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে: মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে বিকল্প দেশ থেকে জ্বালানি আমদানির চুক্তি করা।দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও কৃষি উৎপাদনে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া।প্রবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও নতুন শ্রমবাজার খোঁজা।
যুদ্ধ কোনো দেশের জন্যই সুখবর নয়, বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য এটি এক বিশাল পরীক্ষা। দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ মানেই একটি দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক মন্দার হাতছানি। তাই এখন থেকেই সঠিক পরিকল্পনা ও সাশ্রয়ী নীতি গ্রহণ করা জরুরি।