এনামুল হক রাশেদী, চট্টগ্রাম >>> দেশে চলমান গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে সার উৎপাদন খাতে। পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ না থাকায় চট্টগ্রামের আনোয়ারায় অবস্থিত দেশের দুই বৃহৎ ইউরিয়া সার কারখানা—চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড (সিইউএফএল) ও কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (কাফকো)-এ অনির্দিষ্টকালের জন্য উৎপাদন বন্ধ রাখা হয়েছে।কারখানা সূত্র জানায়, গত বুধবার বিকেল থেকে সরকারি উচ্চপর্যায়ের নির্দেশনায় দুই কারখানায় গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়। ফলে উৎপাদন কার্যক্রম স্থগিত রাখতে বাধ্য হয়েছে কর্তৃপক্ষ।সংশ্লিষ্টরা জানান, ইউরিয়া সার উৎপাদনের প্রধান কাঁচামালই হচ্ছে প্রাকৃতিক গ্যাস। গ্যাসের দহন ও রাসায়নিক প্রক্রিয়া ছাড়া অ্যামোনিয়া বা ইউরিয়া উৎপাদন সম্ভব নয়। শুধু গ্যাস থাকলেই হয় না, উৎপাদনের জন্য নির্দিষ্ট মাত্রার চাপও প্রয়োজন। কিন্তু বর্তমানে জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের চাপ এতটাই কমে গেছে যে এই অবস্থায় উৎপাদন চালিয়ে যাওয়া কঠিন এবং যন্ত্রপাতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সিইউএফএল প্রতিদিন প্রায় ১১০০ থেকে ১২০০ টন ইউরিয়া উৎপাদন করে। অপরদিকে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান কাফকোর দৈনিক উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ১৭২৫ টন ইউরিয়া এবং ১৫০০ টন অ্যামোনিয়া। ফলে দুটি কারখানা বন্ধ থাকায় প্রতিদিন প্রায় তিন হাজার টন ইউরিয়া উৎপাদন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে দেশ। দীর্ঘ সময় উৎপাদন বন্ধ থাকলে সার আমদানির ওপর নির্ভরশীলতা বাড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন।রাষ্ট্রায়ত্ত সিইউএফএলের জন্য এ ধরনের উৎপাদন বন্ধ নতুন নয়। গত বছরের ১ নভেম্বর দীর্ঘ সাড়ে ছয় মাস বন্ধ থাকার পর কারখানাটি চালু করা হয়েছিল। কিন্তু এরপরও যান্ত্রিক ত্রুটি ও অনিয়মিত গ্যাস সরবরাহের কারণে বারবার উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। এতে শ্রমিকদের মধ্যেও হতাশা দেখা দিয়েছে।অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মানের সার কারখানা কাফকোও গত বছরের অক্টোবরে যান্ত্রিক সমস্যার কারণে প্রায় দুই সপ্তাহ বন্ধ ছিল। এবার জাতীয় পর্যায়ের গ্যাস সংকট তাদের উৎপাদনে নতুন করে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।কাফকোর কারিগরি বিভাগের এক প্রকৌশলী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, কম চাপে প্ল্যান্ট চালালে কোটি কোটি টাকার যন্ত্রপাতির দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির ঝুঁকি থাকে। তাই নিরাপত্তার স্বার্থে উৎপাদন স্থগিত রাখা হয়েছে।সিইউএফএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিজানুর রহমান বলেন, গ্যাস সংকটের কারণে সরকারের নির্দেশনায় কারখানার উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হলে পুনরায় উৎপাদন শুরু করা হবে।বাংলাদেশে রবি মৌসুম এবং সামনে আউশ ও আমন চাষের প্রস্তুতির সময় ইউরিয়া সারের চাহিদা বেশি থাকে। চট্টগ্রামের এই দুই কারখানায় উৎপাদিত সার দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বাফার গুদামে পাঠানো হয় এবং সেখান থেকে ডিলারদের মাধ্যমে কৃষকদের কাছে পৌঁছায়।কৃষি সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, দ্রুত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে বাজারে সারের সংকট দেখা দিতে পারে। আনোয়ারা এলাকার কৃষক আলাউদ্দিন বলেন, কারখানায় সার উৎপাদন বন্ধ থাকলে বাজারে সারের দাম বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে কৃষকরা বিপাকে পড়বেন।এদিকে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) সূত্র জানায়, গ্যাস সরবরাহকারী পেট্রোবাংলা এবং জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। জাতীয় গ্রিডে এলএনজি সরবরাহ বাড়লে সার কারখানাগুলোকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গ্যাস দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের জ্বালানি খাতে অস্থিরতা শিল্পখাতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ডলার সংকটে এলএনজি আমদানিতে ধীরগতি এবং দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে কৃষি খাতে নিরবচ্ছিন্ন সার সরবরাহ অত্যন্ত জরুরি। তাই দ্রুত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করে কারখানাগুলো চালু করার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।