এনামুল হক রাশেদী,চট্টগ্রাম >>> চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুরে র্যাব কর্মকর্তা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গোটা এলাকা জুড়ে তীব্র উত্তেজনা ও আতঙ্ক বিরাজ করছে। যৌথবাহিনী পুরো এলাকা নিয়ন্ত্রণে নিয়ে সন্ত্রাসীদের ধরতে বৈঠকের পর বৈঠক করছে। যে কোনো মুহূর্তে সেখানে বড় ধরনের অভিযান শুরু হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।বছরের পর বছর ধরে লোকচক্ষুর আড়ালে গড়ে ওঠা এই সন্ত্রাসী সাম্রাজ্য সম্পর্কে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তর অবগত থাকলেও রহস্যজনক কারণে তা ভাঙা সম্ভব হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত বিভিন্ন মহলের যোগসাজশ ও কোটি কোটি টাকার ভাগ-বাঁটোয়ারার কারণে এই অপরাধচক্র এতদিন বহাল তবিয়তে টিকে ছিল।পাহাড়ের আড়ালে সমান্তরাল শাসনব্যবস্থা এক সময় পাহাড়, বন ও নির্জন প্রকৃতির জন্য পরিচিত জঙ্গল সলিমপুর এখন ভয়ংকর অপরাধের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। প্রায় ৪০০ একর সরকারি পাহাড় কেটে গড়ে তোলা হয়েছে অবৈধ বসতি, যেখানে সরকারি জমি দখল, প্লট বাণিজ্য, হত্যা, গুম, মাদক ও সন্ত্রাস—কোনো অপরাধই বাদ নেই। শহরের একেবারে কাছেই হলেও এলাকাটি এতটাই দুর্গম যে ভেতরে না গেলে বাস্তব চিত্র বিশ্বাস করা কঠিন।প্রায় ১০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এই অঞ্চলে রয়েছে কড়া পাহারা। অপরিচিত কেউ ঢুকলেই তাকে জবাবদিহির মুখে পড়তে হয়। হুমকি-ধমকি নিত্যদিনের ঘটনা। অভিযানের সময় নারীদের সামনে রেখে ব্যারিকেড তৈরি করাও এখানকার পরিচিত কৌশল।নব্বইয়ের দশক থেকে অপরাধের বিস্তারঃপুলিশ ও প্রশাসন সূত্র জানায়, নব্বইয়ের দশক থেকেই জঙ্গল সলিমপুরকেন্দ্রিক অপরাধের বিস্তার শুরু হয়। সরকারি পাহাড় দখল করে প্লট বিক্রির মাধ্যমে শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে অপরাধীরা। দীর্ঘদিন এই সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রণে ছিল আলী আক্কাস, মশিউর ও মো. ইয়াসিন।২০১০ সালে র্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে আলী আক্কাস নিহত হলে আধিপত্যের ভারসাম্য নষ্ট হয়। এরপর মশিউর ও ইয়াসিনের মধ্যে শুরু হয় নিয়ন্ত্রণের লড়াই। ২০২১ সালের ৬ ডিসেম্বর মশিউর এবং ২০২২ সালের জুলাইয়ে ইয়াসিন গ্রেপ্তার হলেও অপরাধ কাঠামো ভাঙেনি।২৪ হাজার পরিবার, লক্ষাধিক মানুষের বসবাস জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, ২০০০ সালের পর বিভিন্ন এলাকা থেকে পালিয়ে আসা চিহ্নিত অপরাধীরা এখানে আশ্রয় নিতে শুরু করে। বর্তমানে জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় ২৪ হাজারের বেশি পরিবার, অর্থাৎ লক্ষাধিক মানুষের বসবাস। আলীনগরে প্রবেশ করতে পরিচয়পত্র দেখাতে হয়, অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল নেওয়া নিষিদ্ধ এবং প্রবেশমুখে সার্বক্ষণিক সোর্স বসানো থাকে।২০১৭ ও ২০১৯ সালে উচ্ছেদ অভিযানে প্রশাসন প্রবল বাধার মুখে পড়ে। এমনকি গত ১৪ মে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবের সলিমপুর পরিদর্শনেও মানববন্ধন তৈরি করে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করা হয়।ছিন্নমূল সংগঠনের আড়ালে অপরাধচক্র অনুসন্ধানে জানা গেছে, ‘চট্টগ্রাম মহানগর ছিন্নমূল বস্তিবাসী সমন্বয় সংগ্রাম পরিষদ’ নামে ব্যানারসর্বস্ব একটি সংগঠনের মাধ্যমে পুরো এলাকা নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। এই সংগঠনের সদস্য সংখ্যা ২৫ হাজারের বেশি। অনেকেই নিজেদের শেষ সম্বল বিক্রি করে ২৫ হাজার থেকে ৩ লাখ টাকা দিয়ে প্লট কিনেছেন।এলাকাটি ১১টি সমাজে ভাগ করে ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ছিন্নমূল নেতাদের হাতে। ভেতরে রয়েছে ডজনখানেক মসজিদ, মাদরাসা, স্কুল, এতিমখানা, কবরস্থান, মন্দির, কেয়াং, গির্জা ও শ্মশান।র্যাব সদস্য হত্যায় ফের আলোচনায়!সর্বশেষ সন্ত্রাসীদের সংঘবদ্ধ হামলায় র্যাব-৭-এর ডিএডি নায়েব সুবেদার মো. মোতালেব হোসেন ভূঁইয়ার নিহত হওয়ার ঘটনায় এই ভয়ংকর বাস্তবতা আবার সামনে আসে। ঘটনার পর থেকে পুরো জঙ্গল সলিমপুর থমথমে হয়ে আছে। দোকানপাট বন্ধ, মানুষের চলাচল সীমিত।র্যাব-৭-এর সিনিয়র সহকারী পরিচালক এ আর এম মোজাফফর হোসেন জানান, সন্ত্রাসী গ্রেপ্তারে অভিযানের সময় ৪০০ থেকে ৫০০ দুষ্কৃতকারী অতর্কিত হামলা চালায়। এতে চারজন র্যাব সদস্য গুরুতর আহত হন। পরে চট্টগ্রাম সিএমএইচে নেওয়া হলে মো. মোতালেব হোসেন ভূঁইয়াকে মৃত ঘোষণা করা হয়।বড় প্রশ্ন!এই ঘটনার পর প্রশ্ন উঠেছে—জঙ্গল সলিমপুর কি সন্ত্রাসীদের অপরাধের স্বর্গরাজ্য হিসেবেই থেকে যাবে, নাকি এবার এই অপরাধ সাম্রাজ্য সমূলে ধ্বংস হবে? সেই উত্তর এখন গোটা চট্টগ্রামবাসীর প্রত্যাশা।