আব্দুল্লাহ আল মারুফ নিজস্ব প্রতিবেদক >>> পুলিশের কনস্টেবল থেকে শুরু করে কিছু ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জড়িয়ে পড়ছে নানা অপরাধে। প্রায় প্রতিদিনই পুলিশের নানা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ জমা পড়ছে পুলিশ সদর দপ্তরে। চাঁদাবজি, এলাকায় প্রভাব বিস্তার, আসামি ধরার নামে অর্থ আদায়, জমিজমা-সংক্রান্ত মামলায় হস্তক্ষেপ, মিথ্যা মামলা থেকে রেহাইয়ের নামে টাকা কামানো, পরকীয়া, নারী নির্যাতনের অভিযোগই সবচেয়ে বেশি আসছে। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আসে, পুলিশ তদন্ত করে কোনোটার সত্যতা পাচ্ছে আবার কোনোটার সত্যতা মিলছে না। সত্যতা মেলার পর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার পরও বহাল তবিয়তে পার পেয়ে যাচ্ছেন অনেকে। এই নিয়ে পুলিশের কর্তারাও নাখোশ।
গত এক বছরে এক হাজারের বেশি অভিযোগ জমা পড়েছে বলে পুলিশের একটি সূত্র বাংলাদেশ সংবাদ প্রতিদিন কে জানিয়েছে। এর মধ্যে প্রায় দুই শতাধিক পুলিশ সদস্যর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলেও তারা থাকছেন বহাল তবিয়তে। তারা রাজনৈতিক নেতাসহ নানা পেশার ‘প্রভাবশালী লোকদের’ দিয়ে তদবির করিয়ে পার পেয়ে যাচ্ছেন। বিভাগীয় মামলা দিয়েও তাদের রোখা যাচ্ছে না।অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, পুলিশের কোনো সদস্য অপরাধ করলে তার বিরুদ্ধে দেশের প্রচলিত আইনে বিচারের বিধান থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা কার্যকর হচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে ফৌজদারি অপরাধের বিচারও করা হয় বিভাগীয় আইনে। এ ক্ষেত্রে অভিযুক্তদের ‘বিভাগীয় শাস্তির আওতায়’ আনার কথা বলে আড়াল করা হচ্ছে। উন্নত বিশ্বে পুলিশের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ এলে আলাদা কমিশন করে তার বিচার করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশে কমিশন গঠন করা হচ্ছে না।
সংশ্লিষ্টরা বাংলাদেশ সংবাদ প্রতিদিন কে জানান, পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগের মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় পুলিশ কর্মকর্তারাও অনেকটা বিব্রত। এ নিয়ে পুলিশ সদর দপ্তরে কয়েক দফা বৈঠক করেছেন আইজিপিসহ ঊর্ধ্বতনরা। পুলিশের অপরাধ রুখতে প্রতিটি জেলায় গোয়েন্দাদের নিয়ে বিশেষ টিম কাজ করছে। তারপরও নিয়ন্ত্রণে আসছে না।অভিযোগ উঠেছে, পুলিশের গুরুতর অপরাধেও দেওয়া হয় লঘুদণ্ড। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অপরাধ করেও শাস্তি পেতে হয় না। আবার অনেক ক্ষেত্রে বিভাগীয় শাস্তির নামে যেসব শাস্তি দেওয়া হয়, পুলিশের কোনো সদস্য অপরাধ করলে তার বিরুদ্ধে দেশের প্রচলিত আইনে বিচারের বিধান থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা কার্যকর হচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে ফৌজদারি অপরাধের বিচারও করা হয় বিভাগীয় আইনে।
পুলিশ আইন অনুযায়ী, কোনো পুলিশ সদস্য অপরাধমূলক কাজে জড়ালে তার বিরুদ্ধে দুই ধরনের বিভাগীয় শাস্তির (লঘু ও গুরু) বিধান আছে। গুরুদণ্ডের আওতায় চাকরি থেকে বরখাস্ত, পদাবনতি, পদোন্নতি স্থগিত, বেতনবৃদ্ধি স্থগিত ও চাকরিকালীন সুযোগ-সুবিধা রহিত করা হয়। অপরাধ প্রমাণ হলে বরখাস্ত করা হয়। গুরুদণ্ডের বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগ আছে। ছোট অনিয়ম বা অপরাধের জন্য দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার, অপারেশনাল ইউনিট থেকে পুলিশ লাইনস বা রেঞ্জে সংযুক্ত করে লঘুদণ্ড দেওয়া হয়। বিসিএস ক্যাডারের পুলিশ কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে সরকারি চাকরি আইন-২০১৮ (শৃঙ্খলা ও আপিল) অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়। সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) থেকে তদূর্ধ্ব কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ খতিয়ে দেখতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগে একটি সেল রয়েছে।
জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যারা অপরাধ করবে তাদের শাস্তি পেতেই হবে। পুলিশ হোক বা অন্য কেউ হোক। আমরা কাউকেই কিন্তু ছাড় দিচ্ছি না। এডিসি হারুন-অর-রশীদের বিরুদ্ধে আমরা ব্যবস্থা নিয়েছি। পুলিশের অনেকের বিরুদ্ধে অভিযোগ আসে তা সত্য। তবে অভিযোগগুলো তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’ একই কথা বলেছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন। তিনি বলেন, ‘ব্যক্তির দায় পুরো পুলিশ বাহিনী নেবে না। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আসছে, তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। কোনো তদবিরই আমরা আমলে নিচ্ছি না। পুলিশের পোশাক পরে অপরাধ করতে পারবে না। জনগণের সেবক হয়ে কাজ করতে হবে। যারা অপরাধ করবে তাদের শাস্তির আওতায় আনা হবেই।’নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমাদের কাছে রাজনৈতিক তদবির আসে। অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তা বা পুুলিশ সদস্যরা এমন জায়গা থেকে তদবির করান তখন আমাদের করার কিছুই থাকে না। সম্প্রতি ডিএমপির রমনা জোনের এডিসি (বরখাস্ত হওয়া) হারুন-অর-রশীদ নিজেকে বাঁচাতে বিভিন্ন মহলে তদবির করছেন বলে তথ্য এসেছে। তিনি আরও বলেন, কিছুদিন পরই এসব ঘটনা ধামাচাপা পড়ে যাবে। যতদিন রাজনৈতিক বলয় থেকে আমরা মুক্ত হতে পারব না, ততদিন তদবির আমাদের শুনতেই হবে। পুলিশের কতিপয় সদস্যর বিরুদ্ধে অপহরণ, চাঁদাবাজি, অর্থ আত্মসাৎ, মাদক কারবার, নির্দোষ ব্যক্তিদের মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়াসহ নানা অভিযোগ আসছে বেশি।পুলিশ সূত্র জানায়, সাম্প্রতিককালে কিছু পুলিশ সদস্যের আচরণ পুরো বাহিনীকে ইমেজ সংকটের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, সাধারণ লোকজনকে আটকে অর্থ আদায়, রিমান্ডের নামে নির্যাতন, ক্রসফায়ারের ভয়, থানায় আটকে পিটিয়ে হত্যা, গুলি করে পঙ্গু করে দেওয়া, শ্লীতাহানিসহ নানা অভিযোগ উঠে আসছে কিছু পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে। তাদের মধ্যে কারোর রয়েছে ক্ষমতার দাপট, কারও আঞ্চলিক ইজম, আবার কেউ কেউ তোষামোদী বা অর্থের জোড়ে আদায় করে নিচ্ছেন নানা সুযোগ-সুবিধা। এদের কারণেই পেশাদার পুলিশ সদস্যরা অনেকটাই কোণঠাসা।তবে পুলিশের সৎ কর্মকর্তারা দুর্নীতিবাজ পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে একাট্টা হয়েছেন। গত বছরে জুলাই মাসে রাজধানীর গাবতলী বাস টার্মিনালের সামনে একটি সোনার দোকানের কর্মচারীর কাছ থেকে ৩৮ ভরি ১৪ আনা স্বর্ণালঙ্কার ছিনতাই করে পুলিশের এক এএসআইর নেতৃত্বে একটি ছিনতাইকারী চক্র। পুলিশের কাছে অভিযোগ আসার পর চক্রের মূলহোতা রূপনগর থানার এএসআই জাহিদুল ইসলাম গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করলে আরও ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে জাহিদ। এমনকি জাহিদ কয়েকজন সহকর্মীর নামও বলেছেন। ওই ঘটনায় রূপনগর থানার এসআই মাসুদুর রহমানকে থানা থেকে ক্লোজও করা হয়েছিল। বর্তমানে তিনি ‘ভারমুক্ত’ হয়ে গেছেন। চট্টগ্রামে ইয়াবাসহ সিএমপির বিশেষ শাখার কনস্টেবল উপল চাকমা, নান্টু দাশ, কামরুল ইসলাম ও মো. গিয়াসউদ্দিন নামে চারজনকে গ্রেপ্তার করে র্যাব। তাদের কাছ থেকে ৫ হাজার ২৬০ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। তারা জামিন পেয়ে চাকরি পেতে নানা জায়গায় তদবির করছেন। বছর দুয়েক আগে দিনাজপুরে মা ও ছেলেকে অপহরণের পর ১৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ আদায়ের সময় সিআইডির এএসপি সারোয়ার কবীর, এএসআই হাসিনুর রহমান ও কনস্টেবল আহসানুল উল ফারুক, ফসিউল আলম পলাশ ও হাবিব মিয়া গ্রেপ্তার হন। তারা জামিনে বের হয়ে গেছেন কিছুদিন আগে। এখন চাকরি ফিরে পেতে তদবির করাচ্ছেন।ছাত্রলীগের দুই নেতাকে পেটানোর ঘটনায় অভিযুক্ত এডিসি হারুন-অর-রশীদের পরিবারের সবাই ‘বিএনপি-জামায়াত সমর্থক’ বলে দাবি করেছেন ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী। গত রবিবার নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, হারুনের বাবার নাম জামাল উদ্দিন গাজী। তার গ্রামের বাড়ি সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার শ্রীউলা ইউনিয়নের থানাঘাটা এলাকায়। হারুনের বাবা মাড়িয়ালা মাধ্যমিক বিদ্যালয়, আশাশুনির ইংরেজি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ও মাতা শেফালী বেগম উভয়ই জামায়াত সমর্থক। নানা মৃত বাবর আলী সানা একজন মুসলিম লীগার ও সক্রিয় জামায়াত নেতা ছিলেন। মামা হুমায়ুন কবির ও মিলন বিএনপি সক্রিয় কর্মী। এ ছাড়া বাবা ও মায়ের পরিবারের সব সদস্য বিএনপি-জামায়াত সমর্থক। ২০১৭ সালে কক্সবাজারে ১০ লাখ পিস ইয়াবা উদ্ধার করে জব্দ দেখানো হয় মাত্র ১০ হাজার। বাকি ৯ লাখ ৯০ হাজার পিস বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগ প্রমাণ হয় পুলিশের নিজস্ব তদন্তে। ওই ঘটনায় ছয় কর্মকর্তা ও তিন কনস্টেবলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলেও তখনকার এসপি এ কে এম ইকবাল হোসেন ও দুই অতিরিক্ত পুলিশ সুপারকে নামমাত্র তিরস্কার করা হয়। তিরস্কৃত এসপি ইকবাল হোসেন অতিরিক্ত ডিআইজি পদে পদোন্নতিও পেয়েছেন।নারায়ণগঞ্জের পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগে জালিয়াতির ঘটনায় রূপগঞ্জ থানার ওসি মাহমুদ হাসান, ইন্সপেক্টর নজরুল ইসলাম, আসলাম হোসেনসহ ছয় এসআইর বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তির সুপারিশ করা হলেও নামকাওয়াস্তে শাস্তি দেওয়া হয়। তারা পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটিতে গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করছেন। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে সিলেটে একজন মুক্তিযোদ্ধার বাড়িসহ সাতটি বাড়িতে মাদক উদ্ধারের নামে অভিযান চালান সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রিপন কুমার মোদক। এ সময় অন্তঃসত্ত্বা নারীসহ কয়েকজনকে হেনস্তা করেছেন বলে গুরুতর অভিযোগ ওঠে। পুলিশ তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বললেও নেওয়া হয়নি কোনো ব্যবস্থা। নিজেকে রক্ষা করতে তিনি বিভিন্ন মহলে তদবির করছেন ৷২০২১ সালে কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার এসএম তানভীর আরাফাত ভেড়ামারা পৌরসভা নির্বাচনে এক বিচারিক হাকিমের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে সমালোচনায় করেন ওই ঘটনায় হাইকোর্ট তানভীরকে তলব করলে তিনি ‘অসৌজন্যমূলক’ আচরণের জন্য নিঃশর্ত ক্ষমা চান। তাকে শাস্তিমূলক হিসেবে বদলি করা হয়। কিন্তু তদবির করে পার পেয়ে যান বড় ধরনের শাস্তি থেকে। এরকম একাধিক অভিযোগ রয়েছে পুলিশের বিরুদ্ধে।