১৫ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২রা ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ |
আন্তর্জাতিক:
  • প্রচ্ছদ
  • অন্যান্য
  • ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন: হার-জয়ের বাইরে রাজনৈতিক বাস্তবতা
  • ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন: হার-জয়ের বাইরে রাজনৈতিক বাস্তবতা

      বাংলাদেশ সংবাদ প্রতিদিন

    এনামুল হক রাশেদী >>> বাংলাদেশের সদ্য অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে দেশজুড়ে চলছে বিজয়ের উল্লাস ও পরাজয়ের ব্যাখ্যা। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই নির্বাচন শুধু জয়-পরাজয়ের হিসাবেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি বাংলাদেশের রাজনীতির ভবিষ্যৎ গতিপথের গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করছে।নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠনের পথে যাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল নেতৃত্বাধীন জোট। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় এটি জনগণের রায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। গণতান্ত্রিক রীতিতে এটিই জনগণের রায়। এই রায়ের প্রতি সম্মান জানানোই রাজনৈতিক পরিপক্বতার পরিচয়। ব্যক্তিগতভাবে আমি বিজয়ী জোটকে অভিনন্দন জানাই এবং আশা করি, তারা এই জনরায়কে যথাযথ মর্যাদা দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনায় দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখবে।এই ফলাফল জামায়াতের জন্য কি অপ্রত্যাশিত ছিল? আমার মনে হয় না। নির্বাচনের অনেক আগেই জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান ঘোষণা দিয়েছিলেন—নির্বাচন সুষ্ঠু হলে যে কোনো ফলাফল মেনে নেওয়া হবে এবং বিরোধী দলে থেকে গঠনমূলক ভূমিকা পালন করা হবে। অর্থাৎ রাজনৈতিকভাবে তারা মানসিক প্রস্তুতিতেই ছিল। রাজনৈতিক পরিপক্বতার অংশ হিসেবে এই রায়ের প্রতি সম্মান জানানোই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।এদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এই নির্বাচনে বিরোধী দলে অবস্থান করলেও রাজনৈতিকভাবে নিজেদের অপ্রাসঙ্গিক মনে করছে না দলটি। নির্বাচনের আগেই জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান ঘোষণা দিয়েছিলেন, নির্বাচন সুষ্ঠু হলে যে কোনো ফলাফল মেনে নেওয়া হবে এবং সংসদে গঠনমূলক বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করা হবে।নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) গভীর রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে ডা. শফিকুর রহমান জানান, জামায়াতে ইসলামী সামগ্রিক ফলাফলকে স্বীকৃতি দিয়ে নীতিবান ও শান্তিপূর্ণ বিরোধী দল হিসেবে কাজ করবে। তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি শক্তিশালী করা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং নাগরিক অধিকার রক্ষায় দলটি সচেষ্ট থাকবে। পাশাপাশি সরকারকে জবাবদিহির আওতায় রাখতে সংসদে কার্যকর ভূমিকা পালন করা হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।জামায়াত আমির আরও বলেন, ৭৭টি আসন নিয়ে সংসদে উপস্থিতি প্রায় চারগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা দলটিকে দেশের অন্যতম শক্তিশালী বিরোধী দলে পরিণত করেছে। এই প্রেক্ষাপটকে তিনি রাজনৈতিক ভাগ্য পরিবর্তনের সূচক হিসেবেও উল্লেখ করেন। উদাহরণ হিসেবে তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ২০০৮ সালে বিএনপি মাত্র ৩০টি আসনে নেমে গিয়েছিল এবং দীর্ঘ ১৮ বছর পর ২০২৬ সালে সরকার গঠনের সুযোগ পেয়েছে।তবে নির্বাচনকে ঘিরে অনিয়মের অভিযোগও তুলেছেন জামায়াত আমির। তার অভিযোগ অনুযায়ী, প্রার্থী বাছাইয়ে কারচুপি, বিভিন্ন জায়গায় রেজাল্ট শিটে ঘষামাজা এবং কিছু আসনে দ্বৈত নীতি অবলম্বন করা হয়েছে। তিনি বলেন, ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের কর্মী-সমর্থক ও এজেন্টদের ওপর বিভিন্ন এলাকায় হামলার ঘটনা ঘটেছে, বাড়িতে আগুন দেওয়া হয়েছে। এসবকে তিনি ‘ফ্যাসিবাদী তৎপরতা’ হিসেবে উল্লেখ করেন।নির্বাচন পরবর্তী সময়ে তার সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন ১১ দলীয় জোটের শরিক দল এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হকসহ অন্যান্য নেতারা।বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াত প্রকৃত অর্থে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি ভোট ও আসন পেয়েছে। দলটির ভোট প্রায় তিন গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। তবে জামায়াত ক্যাডারভিত্তিক দল হওয়ায়—যেখানে শপথভুক্ত কর্মী না হলে মনোনয়ন পাওয়া যায় না—এই কাঠামোর মধ্যেও সাধারণ ভোটারের সমর্থন পাওয়া রাজনৈতিকভাবে উল্লেখযোগ্য ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ইসলামী ছাত্র শিবিরের একক বিজয় জামায়াতের প্রতি প্রত্যাশা বাড়িয়ে দিয়েছিল। ফলে জাতীয় নির্বাচনে দলটির প্রতি অতিরিক্ত আশা তৈরি হয়। কিন্তু বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয় রাজনীতি আর জাতীয় রাজনীতি এক নয়—এই বাস্তবতা এবারের নির্বাচনে স্পষ্টভাবে সামনে এসেছে।দেড় দশকের বেশি সময় ধরে রাজনৈতিক দমন-পীড়নের পর জামায়াতের ঘুরে দাঁড়ানোকে অনেকেই ‘রাজনৈতিক বিস্ময়’ হিসেবে দেখছেন। ১১ জন শীর্ষ নেতার ফাঁসি, শত শত কর্মীর মৃত্যু, হাজার হাজার নেতাকর্মীর গৃহহীনতা ও আর্থিকভাবে সংগঠনকে দুর্বল করার প্রচেষ্টার মধ্যেও দলটি আবার শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছে।বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেন, বর্তমানে বিরোধী দলে থাকাই জামায়াতের জন্য তুলনামূলক নিরাপদ ও ফলপ্রসূ। এতে তারা সংগঠনকে তৃণমূল পর্যায়ে শক্তিশালী করার সুযোগ পাবে এবং জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করতে পারবে। পাশাপাশি নতুন সরকার যদি রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যর্থ হয়, ভবিষ্যতে বিকল্প শক্তি হিসেবে সামনে আসার সুযোগও তৈরি হবে।অন্যদিকে, নির্বাচনকে ঘিরে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অভিযোগও উঠেছে। বিশ্লেষকদের তথ্য অনুযায়ী, পিরোজপুর-২ আসনে দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর পুত্র মাত্র ৭০ ভোটে পরাজিত হয়েছেন, খুলনায় মিয়া গোলাম পরওয়ার প্রায় ২ হাজার ভোটে পরাজিত হয়েছেন এবং ৫৩টি আসনে জামায়াত ৫ হাজারের কম ভোটে হেরেছে। এসব আসনে কারচুপি হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।তবে রাজনৈতিক বাস্তবতায় জামায়াত এসব অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও ফলাফল মেনে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক রাজনীতির চাপ, আঞ্চলিক শক্তির অবস্থান এবং অভ্যন্তরীণ শক্তির ভারসাম্য বিবেচনায় দলটি আপাতত সংঘাতমুখী পথে না গিয়ে সংগঠন পুনর্গঠনের কৌশল বেছে নিয়েছে।সব মিলিয়ে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই নির্বাচন শুধু কে জিতল আর কে হারল—তার চূড়ান্ত উত্তর দেয় না। বরং এটি দেখিয়েছে, বাংলাদেশের রাজনীতি আবার প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ধারায় ফিরছে। বিএনপি সরকার গঠন করলেও তাদের সামনে কঠিন দায়িত্ব—প্রমাণ করতে হবে তারা কেবল ক্ষমতায় আসেনি, কার্যকরভাবে শাসন করতেও সক্ষম।গণতন্ত্রে শেষ কথা কোনো একক নির্বাচনে লেখা হয় না; শেষ কথা লেখা হয় জনগণের আস্থায়।

    মন্তব্য

    আরও পড়ুন

    You cannot copy content of this page