আনোয়ার হোসেন- কিশোরগঞ্জ(নীলফামারী)প্রতিনিধিঃ
কালের আবর্তে প্রাচীন বাংলার ঐতিহ্যবাহী কুমারের নিপূন হাতে মাটির তৈরি তৈজসপত্র বিলিনের পথে।একসময় অন্যাঞ্চলের ন্যায় নীলফামারীর কিশোরগঞ্জে গৃহস্থালী নানা কাজে অত্যাবশ্যকীয় উপকরণ ছিল এটি।এতে মাটির জিনিসপত্রের ব্যাপক চাহিদা ও কদর ছিল।একে কেন্দ্র করে পার্শবর্তী উপজেলা সৈয়দপুরের কাশিরাম বেলপুকুর ইউপির চওড়া পালপাড়াসহ আশপাশের কয়েক গ্রামে গড়ে ওঠে সুপ্রসিদ্ধ মৃৎশিল্প।এ শিল্পের উপর নির্ভর করে কিশোরগঞ্জ উপজেলার অনেক নিম্ন আয়ের মানুষ জীবিকা নির্বাহ করতো।তারা ওই গ্রামগুলো(৩০কিঃমিঃ দুরত্ব)থেকে কাঁধের ভাড় বাইঙ্কায় বিভিন্ন ধরনের মাটির জিনিসপত্র পাইকারি কিনে এনে বিভিন্ন গ্রাম,পাড়া-মহল্লায় ফেরি করে বিক্রি করতো।হাট-বাজারেও পসরা সাজিয়ে বসত।যা বিক্রিবাট্টা করে তারা ভাল আয়-রোজগারের মুখ দেখতেন।কিন্তু আধুকিতার ছোঁয়ায় মাটির জিনিসপত্রের চাহিদা না থাকায় স্থান দখল করে নিয়েছে সিলভর,অ্যালুমেনিয়াম ও প্লাস্টিকের তৈজসপত্র।এতে এ পেশায় রসদ খুঁজে না পাওয়ায় হাট-বাজার ও মেঠোপথের ফেরিওয়ালারা পেশা বদল করে ভিড়েছেন অন্য পেশায়।অন্যরা পেশা বদল করলেও উপজেলার মাগুড়া ইউপির ঠাঠারি পাড়া গ্রামের বাসিন্দা আনছার আলী(৭৪)এখনো বাপ-দাদার আদি পেশাটিকে ধরে রেখে সংসার চালান।
ঐতিহ্যের পেশাকে গ্রামীণ সমাজে ধরে রাখার জন্য তার জীবন যুদ্ধ।জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও তিনি নিত্যদিন ভ্যান বোঝাই মাটির হরেক তৈজসপত্র নিয়ে গ্রামের পাড়া-মহল্লায় হাঁক ছাড়েন।রাখবেন মাটির হাঁড়ি-পাতিল,ডাকনা,বাসন,কোসন,সারোয়া,কাসা,তেলে ভাজা পিঠার তাওয়া ও ভাপা পিঠার সিদ্ধ হাঁড়ি,কলস।এমন নিরন্তন ছুটে চলা ছোটকাল থেকে।আনছার আলী বলেন,আগে রান্না-বান্না,পানি সংরক্ষণ,খাবার পরিবেশন,ধান সিদ্ধ ও গরুর খাবার-পানি দেয়ার চারি,হাউদা,চাল সংরক্ষণ,মাটির চুলা নির্মান,টাকা-পয়সা সঞ্চয় করণ ব্যাংক,কুয়া,টয়লেটের রিং(পাট)সহ নানা কাজে একমাত্র উপকরণ ছিল মাটির তৈরি।যা এক সময়ে গ্রাম-গঞ্জে বিক্রি করে ভাল আয়ের মুখ দেখতাম।বাপ-দাদারাও এর উপর নির্ভর করে সংসার চালাত।বর্তমানে দস্তা,অ্যালুমেনিয়াম ও প্লাস্টিকের নামি-দামি তৈজস পত্রসহ ১ টাকার অনটাইম গ্লাস-প্লেট বাজার দখল করে নিয়েছে।আর এসব তৈজসপত্রের সহজলভ্যতা,আকর্ষণীয়তা,রুচিবোধ ও স্থায়ীত্বে বিবেচনায় মাটির জিনিসপত্র কিনছেনা মানুষ।কুয়ার পরিবর্তে পানি সরবরাহে ব্যবহার করা হচ্ছে বৈদ্যুতিক সাপ্লাইয়ার,নলকুপ এবং টয়লেটে ইট-সিমেন্টের রিং।এতে মাটির রিং,পাটের ব্যবহারও উঠে গেছে।তবে গ্রামের নিম্ন আয়ের মানুষ মাটির চুলা তৈরি,রান্না,পিঠা সিদ্ধ,চিতই পিঠা ভাজা এরকম কাজে হাঁড়ি পাতিল,তাওয়া,সারোয়া,কাসা,কান্টা,কাটুয়া ব্যবহার করছে।তাদের কিছুটা চাহিদা থেকে বিক্রি করে যে দু/চারশ টাকা আয় হয় তাতে সংসার চলেনা।তবুও বাপ-দাদার ঐতিহ্যের পেশা মাটির জিনিসপত্র নিয়ে পড়ে আছি। সরকারি,বেসরকারিভাবে পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এর পরিধি সম্প্রসারণ করা যেত।পরিবেশবিদদের মতে,মাটির জিনিসপত্র পরিবেশ বান্ধব ও স্বাস্থ্যসম্মত।বিশেষ করে মাটির চুলায় হাঁড়ি-পাতিলে ভাত-তরকারি রান্নার স্বাদ ও পুষ্টিগুন অটুট থাকে।সিলভরের হাড়ি-পাতিল ও অ্যালুমেনিয়ামের রাইসকুকার,কারিকুরারে বৈদ্যুতিক সাহায্য রান্না করা খাবারে স্বাদ ও পুষ্টিগুন তেমন নেই।অপর দিকে অপচনশীল প্লাস্টিকের অনটাইম ক্লাস,প্লেটসহ অন্যান্য ব্যবহার্য জিনিসপত্র যত্রতত্র ফেলে দেয়ায় পরিবেশ প্রকৃতি হুমকির মুখে পড়েছে।তাই মাটির জিনিসকে রক্ষায় সবাইকে এগিয়ে আসা দরকার।মাগুড়া ইউপি চেয়ারম্যান আখতারুজ্জামান মিঠু বলেন,আনছার আলী আধুনিক যুগেও সংগ্রাম করে বাপ-দাদার পেশার ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন।মৃৎশিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে এর বাজার সৃষ্টিসহ সরকারি-বেসরকারিভাবে প্রয়োনীয় পৃষ্ঠপোষকতা খুবই জরুরি।











মন্তব্য