সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি >>> আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্ত জেলা সুনামগঞ্জে এবার চাহিদার চেয়েও বেশি কোরবানিযোগ্য গবাদিপশু প্রস্তুত রয়েছে। জেলা প্রাণিস¤পদ বিভাগের নিবিড় তত্ত্বাবধান এবং স্থানীয় খামারি ও সাধারণ কৃষকদের অক্লান্ত পরিশ্রমে জেলায় এবার পশুর কোনো ঘাটতি নেই। উল্টো অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে বিপুল পরিমাণ পশু উদ্বৃত্ত থাকবে, যার আনুমানিক বাজারমূল্য চারশত কোটি টাকারও বেশি বলে নিশ্চিত করেছে প্রশাসন। সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় গরুর অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকাতে প্রশাসনের কঠোর নজরদারি এবং পশুর খুরা রোগ স¤পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে থাকায় এবার শতভাগ দেশি পশুতে স্বয়ংস¤পূর্ণ সুনামগঞ্জের পশুর বাজার। খামারি ও সাধারণ গৃহস্থরা এবার তাদের পশুর ন্যায্যমূল্য পাওয়ার ব্যাপারে দারুণ আশাবাদী। জেলা প্রাণিস¤পদ কর্মকর্তার কার্যালয়ের চূড়ান্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছর সুনামগঞ্জ জেলায় কোরবানির পশুর সার্বিক চাহিদা নির্ধারণ করা হয়েছে ৫০ হাজার ৪৯৪টি। এর বিপরীতে স্থানীয় খামারি ও কৃষকদের ঘরে স¤পূর্ণ দেশি ও স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে কোরবানিযোগ্য পশু প্রস্তুত রয়েছে ৫৩ হাজার ৪০১টি। ফলে, স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পরও জেলায় ২ হাজার ৯০৭টি গবাদিপশু উদ্বৃত্ত থাকবে। এই উদ্বৃত্ত পশু পার্শ্ববর্তী জেলাসমূহের চাহিদা পূরণে অবদান রাখবে। প্রাণিস¤পদ বিভাগের তথ্যমতে, প্রস্তুতকৃত পশুর সিংহভাগই দেশি গরু। এর মধ্যে রয়েছে,ষাঁড় ২১,১৭৬টি, বলদ ১১,৮৯৭টি, গাভী ৬,৮৪১টি, মহিষ ৪১৫টি, ছাগল ৭,৯৬৩টি, ভেড়া ৪,২২২টি। সুনামগঞ্জ জেলার উপজেলাগুলোর মধ্যে পশুর জোগানে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে শিল্পনগরী ছাতক উপজেলা। এখানে সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৪১৭টি গবাদিপশু উদ্বৃত্ত রয়েছে। এছাড়া সুনামগঞ্জ সদরে ২ হাজার ২১৯টি, দিরাইয়ে ৩৫৫টি, দোয়ারাবাজারে ২৭২টি, ধর্মপাশায় ১২৩টি, শাল্লায় ৮৫টি এবং জগন্নাথপুরে ৮১টি পশু উদ্বৃত্ত রয়েছে। অন্যদিকে, ভৌগোলিক ও স্থানীয় কারণে ৩টি উপজেলায় কিছুটা ঘাটতি রয়েছে। এর মধ্যে জামালগঞ্জে ২ হাজার ৬৫৫টি, তাহিরপুরে ১ হাজার ১২৪টি এবং শান্তিগঞ্জ উপজেলায় ৯৮টি পশুর ঘাটতি দেখা গেছে। তবে জেলা প্রাণিস¤পদ বিভাগ আশ্বস্ত করেছে যে, পার্শ্ববর্তী উপজেলার উদ্বৃত্ত পশু দিয়ে এই অভ্যন্তরীণ ঘাটতি সহজেই পূরণ করা সম্ভব হবে। সুনামগঞ্জের সীমান্তবর্তী হাটগুলোতে অতীতে অবৈধ ভারতীয় গরুর কারণে দেশি খামারিরা প্রায়ই লোকসানের মুখে পড়তেন। তবে এবার চিত্র ভিন্ন। চোরাই পথে গবাদিপশুর অনুপ্রবেশ বন্ধে বিজিবি ও স্থানীয় প্রশাসন সীমান্ত এলাকায় সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। খামারি ও সাধারণ বিক্রেতারা জানান, ভারতীয় গরুর অবৈধ প্রবেশ বন্ধ থাকায় এবং হাটে পর্যাপ্ত দেশি পশু মজুত থাকায় তারা এবার ন্যায্যমূল্য পাবেন। ক্রেতারাও হাটে এসে সুস্থ-সবল দেশি পশু দেখে সন্তোষ প্রকাশ করছেন। বর্তমানে পশুর আকার ও ওজনভেদে দাম ক্রেতাদের নাগালের মধ্যেই রয়েছে মাঝারি ও বড় আকারের গরু সর্বনিু ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত। ছাগল ৫ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা। ভেড়া ৪ হাজার থেকে ১৭ হাজার টাকা। জেলায় বর্তমানে নিবন্ধিত খামারির সংখ্যা ৭৩৭টি। কোরবানি উপলক্ষে ক্রেতা-বিক্রেতাদের সুবিধার্থে জেলাজুড়ে মোট ৬০টি পশুর হাট বসানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে, যার মধ্যে স্থায়ী হাট ২৬টি এবং অস্থায়ী হাট ৩৪টি। হাটে আসা পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা, জরুরি চিকিৎসা এবং কোনো অসুস্থ পশু যেন বিক্রি না হতে পারে, তা নিশ্চিত করতে সার্বক্ষণিকভাবে ১৯টি ভেটেরিনারি মেডিকেল টিম মাঠে নিয়োজিত রাখা হয়েছে। সামগ্রিক প্রস্তুতি ও বাজার পরিস্থিতি নিয়ে সুনামগঞ্জ জেলা প্রাণিস¤পদ কর্মকর্তা ডা. মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, এ বছর জেলায় পর্যাপ্ত পরিমাণ সুস্থ-সবল দেশি পশু প্রস্তুত রাখা হয়েছে। মাঝখানে কিছু এলাকায় পশুর ‘খুরা রোগ’ দেখা দিলেও মাঠপর্যায়ে আমাদের চিকিৎসকদের তৎপরতায় তা এখন স¤পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ক্রেতা বা বিক্রেতা কারও জন্যই শঙ্কার কোনো কারণ নেই। সীমান্তে অবৈধ অনুপ্রবেশ প্রসঙ্গে তিনি দৃঢ়তার সাথে বলেন, আমাদের প্রান্তিক খামারি ও গৃহস্থরা যাতে কোনোভাবেই আর্থিক লোকসানের শিকার না হন, সে জন্য প্রশাসনের সহায়তায় সীমান্তে কঠোর নজরদারি চালানো হচ্ছে। চোরাই পথে ভারতীয় গরু আসার খবর পাওয়া মাত্রই টাস্কফোর্স অভিযান চালাচ্ছে এবং জড়িতদের ভ্রাম্যমাণ আদালতের (মোবাইল কোর্ট) মাধ্যমে জরিমানা ও আইনি ব্যবস্থার আওতায় আনা হচ্ছে। আমরা একটি রোগমুক্ত, নিরাপদ ও উৎসবমুখর পশুর বাজার নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর।
অরুন চক্রবর্তী
সু


মন্তব্য