২৪শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১০ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ |
শিরোনাম:
বিশ্বাসের জায়গাগুলো কতটা নিরাপদ শিশুদের জন্য কক্সবাজার আদালত চত্বরে গোলাগুলি গুলিবিদ্ধ ৫ চট্টগ্রামের বায়েজীদে দেয়াল ধসে শিশুমৃত্যু: অবৈধ পলিথিন কারখানা ঘিরে ক্ষোভ ও আতঙ্ক চট্টগ্রামে বিদ্যানন্দের ‘১ টাকায় কুরবানির বাজার’ চাটখিলে এসএসসি পরীক্ষার্থী নিখোঁজ, তিনদিনেও মেলেনি সন্ধান এক যুগ পর চট্টগ্রাম চেম্বার নির্বাচন সম্পন্ন, ভোটগ্রহণ শেষে চলছে গণনা চট্টগ্রামে নিখোঁজের দুই দিন পর লিফটের গর্তে মিলল যুবকের মরদেহ বাঁশখালীর শীলকূপে পুলিশের বিশেষ অভিযানে মাদক ও জুয়ার সাথে জড়িত ১৩ জন আটক নগর সংলাপে ডিএসসিসি প্রশাসক জলাবদ্ধতা ও মশা নির্মূলে সব রাজনৈতিক দলকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে খাদ্যে বিষক্রিয়াতে শিশুরা বেশি আক্রান্ত হচ্ছে: খাদ্য প্রতিমন্ত্রী
আন্তর্জাতিক:
লেবাননে ইসরাইলি হামলা ৩ স্বাস্থ্যকর্মীসহ নিহত ৫ জাতিসংঘের পরবর্তী মহাসচিব কে লড়াইয়ে ৪ শীর্ষ প্রার্থী মধ্যপ্রাচ্য সংকটে বিপাকে ভারতের বিমান খাত: জ্বালানির আকাশচুম্বী দামে বন্ধ হওয়ার শঙ্কা দেশের সব বিমানবন্দরে সর্বোচ্চ সতর্কতা, জোরদার করা হয়েছে নজরদারি লাহোর থেকে যাতি উমরা স্মৃতির অলিন্দে পাঞ্জাবের আতিথ্য তুরস্কের কাছে ১০০ কোটি ডলার ও সুন্দরী স্ত্রী চাইলেন উগান্ডার সেনাপ্রধান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণে কোনো সীমাবদ্ধতা মানবে না ইরান।। ইসরায়েলি ও মার্কিন বিমান হামলায় আহত ইরানি নেতা কামাল খারাজির মৃত্যু নিখোঁজ পাইলট উদ্ধারের আড়ালে ইউরেনিয়াম চুরির চেষ্টা ছিল বলে অভিযোগ ইরানের ইরানকে ট্রাম্পের আলটিমেটাম ৪৮ ঘণ্টায় হরমুজ না খুললে নামবে নরক
     
             

বিশ্বাসের জায়গাগুলো কতটা নিরাপদ শিশুদের জন্য

  বাংলাদেশ সংবাদ প্রতিদিন

দীপু মাহমুদ >>> সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও তার আশপাশের পরিবেশকে ঘিরে একের পর এক শিশু নির্যাতনের অভিযোগ সামনে এসেছে। রাজধানীর বনশ্রীর একটি হেফজ প্রতিষ্ঠানে এক শিশুর রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনায় পরে গুরুতর নিপীড়নের আলামত নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় স্থানীয় এক ধর্মীয় শিক্ষকের বিরুদ্ধে শিশুকে পাশবিক নির্যাতনের অভিযোগে জনরোষ তৈরি হয়। কুষ্টিয়ায় আবাসিক মাদ্রাসার এক শিক্ষার্থী অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটির ভেতরের পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। সুনামগঞ্জে আরবি পড়তে যাওয়া এক শিশুকে কেন্দ্র করে ইমাম ও শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে। শরীয়তপুর, নেত্রকোনা ও মেহেরপুরেও ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে একাধিক ঘটনা। কোথাও পরিবার অভিযোগ করেছে, কোথাও স্থানীয় মানুষ বিক্ষোভ করেছে, কোথাও আবার প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ নীরবতা নতুন প্রশ্ন তুলেছে। সব মিলিয়ে একটি বিষয় এখন স্পষ্ট—যে জায়গাগুলোকে মানুষ সবচেয়ে নিরাপদ ও বিশ্বাসযোগ্য মনে করে, সেগুলোর নিরাপত্তা কাঠামো নিয়েই নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।গত পাঁচ মাসেরও কম সময়ের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ, হেফজখানা কিংবা আবাসিক পরিবেশকে ঘিরে শিশু নির্যাতনের একের পর এক অভিযোগ সামনে এসেছে। কোথাও মাদ্রাসাশিক্ষকের বিরুদ্ধে, কোথাও ইমামের বিরুদ্ধে, কোথাও আবার প্রতিষ্ঠানের ভেতরের “অভ্যন্তরীণ নীরবতা” নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। প্রতিটি ঘটনার পর জনরোষ তৈরি হয়েছে, বিক্ষোভ হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম উত্তাল হয়েছে। কিন্তু কয়েকদিন পরই সবকিছু আবার স্বাভাবিক হয়ে যায়। থেকে যায় কেবল শিশুদের অদৃশ্য ভয়, পরিবারগুলোর দীর্ঘ ট্রমা এবং সমাজের অস্বস্তিকর নীরবতা এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি- এই সংকট কোনো একক প্রতিষ্ঠান বা কোনো নির্দিষ্ট পোশাকধারী মানুষের সংকট নয়। শিশু নির্যাতন পরিবার, স্কুল, কোচিং, আশ্রম, ক্রীড়া প্রতিষ্ঠান- সবখানেই ঘটতে পারে। কিন্তু ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে মানুষের আস্থা, শ্রদ্ধা এবং নৈতিকতার প্রত্যাশা এত বেশি যে, সেখানে অভিযোগ উঠলে সামাজিক অভিঘাতও অনেক গভীর হয়।নীরবতার সংস্কৃতি বাংলাদেশের সমাজে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে এক ধরনের অপ্রশ্নযোগ্য মর্যাদা তৈরি হয়েছে। ফলে কোনো অভিযোগ উঠলে প্রথম প্রতিক্রিয়া অনেক সময় হয় অস্বীকার, চাপা দেওয়া কিংবা ভুক্তভোগী পরিবারকে চুপ করিয়ে দেওয়া। “প্রতিষ্ঠানের মানহানি হবে”, “ধর্মবিরোধী কথা বলা হচ্ছে”, “বাচ্চা ভুল বুঝেছে”- এ ধরনের প্রতিক্রিয়া প্রায়ই দেখা যায়।এই নীরবতার সুযোগেই অপরাধীরা দীর্ঘ সময় পার পেয়ে যায়। শিশুদের বড় অংশই বুঝতে পারে না তাদের সঙ্গে যা ঘটছে তা অপরাধ। আবার বুঝলেও ভয়, লজ্জা বা শাস্তির আশঙ্কায় তারা কাউকে বলতে পারে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের ওপর যৌন সহিংসতার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ভয়াবহ হতে পারে- ঘুমের সমস্যা, আতঙ্ক, আত্মবিশ্বাস হারানো, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, এমনকি পরবর্তী জীবনে বিষণ্নতা ও সম্পর্কগত জটিলতাও তৈরি হতে পারে।আস্থার সংকট কেন তৈরি হচ্ছে অভিভাবকেরা সাধারণত ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে সন্তান পাঠান নিরাপদ ও নৈতিক পরিবেশের প্রত্যাশায়। কিন্তু যখন বারবার একই ধরনের অভিযোগ আসে, তখন প্রশ্ন ওঠে- এসব প্রতিষ্ঠানে শিশু সুরক্ষার ন্যূনতম কাঠামো আদৌ আছে কি?

অনেক আবাসিক মাদ্রাসা বা হেফজখানায়:

কোনো child protection guideline নেই,

অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ব্যবস্থা নেই,

অভিভাবকের স্বাধীন পর্যবেক্ষণ সীমিত,

শিক্ষক বা কর্মীদের background verification দুর্বল,

শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য বা নিরাপত্তা বিষয়ে প্রশিক্ষণ নেই।

ফলে প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক সময় ব্যক্তিনির্ভর হয়ে পড়ে। একজন সৎ ও দায়িত্বশীল শিক্ষক পুরো পরিবেশ ভালো রাখতে পারেন, আবার একজন বিকৃত মানসিকতার ব্যক্তি বহু শিশুকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারেন।

পরিচিত মানুষই সবচেয়ে বড় ঝুঁকি

বিশ্বব্যাপী শিশু সুরক্ষা বিষয়ক গবেষণাগুলো দেখায়, অধিকাংশ ক্ষেত্রে শিশুরা অপরিচিত কারও নয়, বরং পরিচিত ও বিশ্বাসযোগ্য মানুষের মাধ্যমেই নির্যাতনের শিকার হয়। পরিবার, আত্মীয়, শিক্ষক, ধর্মীয় শিক্ষক- এই “trusted circle”-এর ভেতরেই ঝুঁকি বেশি থাকে। ফলে কেবল “বাইরের হুমকি” নিয়ে আতঙ্কিত থাকলে চলবে না, প্রতিষ্ঠানভিত্তিক নিরাপত্তা সংস্কৃতিও গড়ে তুলতে হবে।

সমস্যাকে অস্বীকার করা সমাধান নয়

প্রতিটি ঘটনার পর দুই ধরনের চরম প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। একপক্ষ পুরো ধর্মীয় শিক্ষা ব্যবস্থাকে দায়ী করে, অন্যপক্ষ সব অভিযোগকে ষড়যন্ত্র বলে উড়িয়ে দেয়। কিন্তু এই দুই অবস্থানের কোনোটিই শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে না।

বাস্তবতা হলো- সব ধর্মীয় শিক্ষক অপরাধী নন। দেশের অসংখ্য মাদ্রাসা ও ধর্মীয় শিক্ষক সততার সঙ্গে কাজ করছেন। কিন্তু কিছু প্রতিষ্ঠানে যদি বারবার নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে, তাহলে সেটিকে “ব্যতিক্রম” বলে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগও নেই। কারণ একটি শিশুর নিরাপত্তা ব্যর্থ হওয়াও একটি গুরুতর সামাজিক ব্যর্থতা।

ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রকৃত শক্তি কখনোই অপরাধ আড়াল করার মধ্যে নয়, বরং দুর্বল ও অসহায় মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মধ্যেই তার নৈতিকতা নিহিত।

প্রতিষ্ঠানগত নীরবতা কেন ভয়ংকর

অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, অভিযোগ ওঠার পর প্রতিষ্ঠান প্রথমেই চেষ্টা করে বিষয়টি “অভ্যন্তরীণভাবে মীমাংসা” করতে। কারণ তারা মনে করে, ঘটনা প্রকাশ পেলে প্রতিষ্ঠানের সুনাম নষ্ট হবে। কিন্তু এই মানসিকতা শেষ পর্যন্ত অপরাধীকেই সুরক্ষা দেয়।

যখন একটি প্রতিষ্ঠান ভুক্তভোগীর চেয়ে নিজের ভাবমূর্তিকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করে, তখন সেখানে জবাবদিহি দুর্বল হয়ে পড়ে। এই সংস্কৃতি ধীরে ধীরে অপরাধীদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করে।

শুধু শাস্তি নয়, প্রতিরোধও দরকার

ঘটনার পর জনরোষ, গ্রেপ্তার বা গণপিটুনি সমাজের ক্ষোভ প্রকাশ করে, কিন্তু এগুলো দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। প্রয়োজন প্রতিরোধমূলক কাঠামো।

শিশু সুরক্ষাকে কেন্দ্র করে এখনই কয়েকটি পদক্ষেপ জরুরি:

সব আবাসিক ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে বাধ্যতামূলক child protection policy চালু করা,

শিক্ষক ও কর্মীদের police verification ও মনস্তাত্ত্বিক screening,

CCTV ও guardian monitoring system,

শিশুদের জন্য safe complaint mechanism,

নির্যাতন শনাক্তকরণ বিষয়ে শিক্ষক-অভিভাবক প্রশিক্ষণ,

নিয়মিত সরকারি ও স্বাধীন safety audit,

শিশুদের “good touch-bad touch” বিষয়ে বয়সোপযোগী শিক্ষা।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে boarding school, church institution কিংবা religious hostel-এ শিশু সুরক্ষার জন্য বাধ্যতামূলক safeguarding protocol চালু হয়েছে। বাংলাদেশেও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসহ সব আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে একই মানদণ্ডে আনতে হবে।

অভিভাবকদেরও সচেতন হতে হবে

শিশুর আচরণে হঠাৎ পরিবর্তন, নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা জায়গাকে ভয় পাওয়া, চুপচাপ হয়ে যাওয়া, ঘুমের সমস্যা, হঠাৎ রাগ বা আতঙ্ক- এসব বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। সন্তানকে এমন পরিবেশ দিতে হবে, যেখানে সে ভয় ছাড়াই নিজের অভিজ্ঞতা বলতে পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- শিশুর কথা মন দিয়ে শোনা। আমাদের সমাজে শিশুর বক্তব্যকে প্রায়ই গুরুত্ব দেওয়া হয় না। অথচ নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিরোধ হতে পারে একটি মনোযোগী পরিবার।

উত্তরণের পথ

সমস্যাকে অস্বীকার না করে স্বীকার করাই পরিবর্তনের প্রথম ধাপ। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে আক্রমণ নয়, বরং আরও নিরাপদ, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করে তোলাই হওয়া উচিত লক্ষ্য। কারণ বিশ্বাসের জায়গাগুলোই যদি নিরাপত্তাহীন হয়ে ওঠে, তাহলে সমাজে আস্থার সংকট আরও গভীর হবে।

শিশুরা “প্রতিষ্ঠানের সম্মান” রক্ষার জন্য জন্মায়নি। বরং প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের প্রথম দায়িত্ব হওয়া উচিত শিশুদের মর্যাদা, নিরাপত্তা ও মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করা। একটি সভ্য সমাজের প্রকৃত পরিচয় তার সবচেয়ে দুর্বল মানুষগুলো কতটা নিরাপদ- সেটির মধ্যেই লুকিয়ে থাকে।

লো ট্রাস্ট মেন্টালিটি থেকে শেষ পর্যন্ত তৈরি হয় লো ট্রাস্ট সোসাইটি।
যেখানে মানুষ প্রতিষ্ঠানকে ভয় পায়, কিন্তু বিশ্বাস করতে পারে না।

লেখক: কথাসাহিত্যিক

মন্তব্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন

You cannot copy content of this page