১৩ই জুলাই, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ | ২৯শে আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ |
আন্তর্জাতিক:
কবিতা প্রেয়সীর দিদার ক্ষেপণাস্ত্রটি বড় ধরনের ওয়্যারহেড বহন করতে সক্ষম : উ.কোরিয়া ক্যারিবীয় অঞ্চলে আঘাত হেনেছে শক্তিশালী হারিকেন ‘বেরিল’ প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে বাইডেন ‘অযোগ্য’, আসছেন মিশেল ওবামা! বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেল মিলান ইতালির পাসপোর্ট এ্যান্ড্রোলমেন্ট অ্যাপয়েন্টমেন্টের ভোগান্তির অবসান হলো- কনসাল জেনারেল। আইআইইউসি বার্তা ২য় সংখ্যা প্রকাশনা বিষয়ক সভা অনুষ্ঠিত ট্রেনের জানালার পাশে বসা কে কেন্দ্রকরে লাথি-ঘুষি, যাত্রী নিহত বিজেপি জোট ৩০০ ছুঁইছুঁই, জরিপের আভাস পেরোল বিরোধীরা ভিনদেশ ভালো পড়ালেখার জন্য গবেষণার বিকল্প নেই’আইআইইউসি চেয়ারম্যান-নদভী আইআইইউসিতে কমিউনিটি হসপিটালের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন
  • প্রচ্ছদ
  • শীর্ষ সংবাদ
  • ন্যায় বিচারের মাধ্যমে ইতিহাস কলংকমুক্ত হোক
  • ন্যায় বিচারের মাধ্যমে ইতিহাস কলংকমুক্ত হোক

      বাংলাদেশ সংবাদ প্রতিদিন

    রিপোর্ট: এডভোকেট শফিউল আজম>>>  মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুর দেশকে ভালবেসে, দেশ মাতৃকাকে স্বাধীন করার পবিত্র মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর লোভনীয় চাকুরী থেকে পালিয়ে এসে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন করেছিলেন। তিনি পাকিস্তানী বাহিনীর সাথে শুধু যুদ্ধ করেননি, মুক্তিবাহিনীর ভিতর কেউ যাতে বিশ্বাসঘাতকতা করতে না পারে সেদিকেও খেয়াল রাখতেন। মুক্তিযুদ্ধে অনুপ্রবেশকারী, দেশদ্রোহী হঠকারী সিদ্ধান্ত গ্রহনকারী, স্বেচ্ছাচারী অনেক সেনা অফিসারকে তিনি যুদ্ধকালীন সাক্ষী প্রমানসহ আটক করে চরম দেশাত্ববোধের প্রমান রেখেছিলেন।ছাত্রজীবন থেকে অসাধারন মেধাবী, তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন চৌকষ এ তরুন সেনানানায়ক দেশের স্বার্থে কারো সাথে আপষ করেননি। পুরো পাকিস্তান এবং বাংলাদেশসেনাবাহিনীর মধ্যে মেজর আবুল মঞ্জুরের মত সাহসী,মেধাবী এবং ইমানদার অফিসার খুব কমই ছিল।তাই চাকুরী জীবনের শুরু থেকেই তিনি বেইমান আর দেশদ্রোহী বিশ্বাসঘাতকদের টার্গেটে পরিনত হয়েছিলেন।

     

    জেনারেল মঞ্জুরের সাথে জিয়ার কোন বিরোধ ছিলনা। জিয়া সরকারের আমলে সেনাবাহিনীতে বহু ক্ষোভ বিক্ষোভ, বিদ্রোহ,রক্তারক্তি, খুনাখুনি হয়েছে।জেনারেল আবুল মঞ্জুর বিরোত্তম এসব কোনকিছুতেই জড়িত ছিলেন এমন কোন প্রমান পাওয়া যায়নি। সেনাসদরে ঘাপটি মেরে থাকা আইএসআই এজেন্টদের তিনি ভালভাবে চিনতেন।এটিই তাঁর জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল। জিয়া চট্টগ্রাম অবস্থানকালীন তাঁর নিরাপত্তার দায়িত্বেও মঞ্জুর ছিলেননা। জিয়া যখন তাঁর প্রধান সেনাপতি এরশাদ কতৃক নিযুক্ত দেহরক্ষী ও কতিপয় অসন্তুষ্ট সৈনিকদের হাতে নির্মমভাবে খুন হন তখন মেজর মঞ্জুর চট্টগ্রাম সেনা সদরের জিওসি হিসেবে নিজ দায়িত্বপালনের জন্য দ্রুত বের হয়ে পড়েন।

     

    জেনারেল মঞ্জুর দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহন করতেছেন বিদ্রোহী সেনাবাহিনীকে নিয়ন্ত্রনে আনার জন্য। তিনি বারবার আহবান জানিয়ে চলেছেন সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে ফেরত যাওয়ার জন্য। কিন্তু ষড়যন্ত্রকারীরা ঢাকায় বসে রেডিওতে প্রচার করে যাচ্ছে মেজর আবুল মঞ্জুর জিয়াকে হত্যা করেছে, তাকে জীবিত অথবা মৃত ধরিয়ে দাও। এদের ষড়যন্ত্র মঞ্জুর বুঝতে পারলেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন জিয়া হত্যার মুল কুশীলবরা তাঁকে বাচতে দেবেনা এবং জিয়া হত্যার রহস্য উম্মোচনের জন্য তাঁকে নিরাপদ স্থান বেছে নিতে হবে। তিনি তাঁর পরিবার, দেহরক্ষী এবং কতিপয় সেনাঅফিসারসহ গাড়ীবহর নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন।রামগড় রোড ধরে তিনি দাতমারা পাহাড়ী চা বাগানে একটি বাড়ীতে আশ্রয় নিলেন পরিবার নিয়ে।

     

    ৩১মে দুপুরের দিকে হাটহাজারীর সার্কেল অফিসার আব্দুল কুদ্দুসের নেতৃত্বে বিশাল পুলিশবাহিনী মঞ্জুরের অবস্থান ঘিরে ফেলে এবং তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। বিকেলে মেজর মঞ্জুরকে হাটহাজারী থানায় নিয়ে আসা হয়। সেনাপ্রধান এরশাদ তখন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সাত্তারের সাথে বৈকঠ করছেন।বিকেল পাঁচটা । মঞ্জুরের ধরা পড়ার খবর পেয়ে এরশাদ লাফ দিয়ে ওঠলেন অনেকটা। সাথে সাথে রাষ্ট্রপতির লাল টেলিফোনে চট্টগ্রামে কাদের কাছে নির্দেশ পাঠালেন মঞ্জুরকে যেন পুলিশের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে পরিকল্পনামত কাজ করা হয়।

     

    জেনারেল মঞ্জুর পুলিশ অফিসার কুদ্দুসকে বলেছিলেন তাঁকে যেন কোনমতেই সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা না হয় এবং যথাসম্ভব আদালতে সোপর্দ করা হয়।কুদ্দুস তাঁকে আশ্বস্ত করেছিলেন। কিন্তু রাত আটটায় ব্রিগেডিয়ার লতিফ,আজিজ, এমদাদসহ কতিপয় কুচক্রী সেনা অফিসার হাটহাজারী থানায় এসে কুদ্দসের সাথে গোপন বৈঠক করে এবং চোখ বেঁধে জেনারেল মঞ্জুরকে গাড়ীতে তুলে রাত ৯টার দিকে চট্টগ্রাম সেনানিবাসে নিয়ে যায়। শুনা যায়, কুদ্দুসের জন্য রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে তার চৌদ্দপুরুষের অার্থিক নিরাপত্তার গ্যারান্টি দেয়া হয়েছিল এরশাদের পক্ষ থেকে। বাস্তবেও দেখলাম, এরশাদ সরকারের সময় কুদ্দুস হয়ে ওঠলেন দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পপতি। বাড়ী,গাড়ী, শিল্প কারখার মালিক।পরের দিন পহেলা জুন রাত্রে ঢাকা থেকে হেলিকপ্টারে করে একজন সেনা অফিসার চট্টগ্রাম সেনাসদরে নামলেন।তিনি সরাসরি হেলিপ্যাড থেকে নেমে মঞ্জুরকে যে ঘরে রাখা হয়েছিল সে ঘরে ঢুকলেন। ঘন্টাখানেক পর মঞ্জুরকে ঠান্ডা মাথায় খুন করে বেরিয়ে সোজা হেলিপ্যাড হয়ে ঢাকা ওড়ে গেলেন। পর্বতপ্রমান

    দেশপ্রেমিক, দেশমাতৃকার সাহসী সৈনিক মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুর বীরোত্তমের নিথর রক্তাক্ত দেহ পড়ে রইল ঘরে। যে ডাক্তার মঞ্জুরের পোষ্ট মর্টেম করলেন তিনি বলেছিলেন মঞ্জুরকে পেছন থেকে মাথার ডানপাশে একটিমাত্র গুলিতে হত্যা করা হয়েছে।

    কে সেই খুনী?কে তাকে পাঠিয়েছিল ঢাকা থেকে? মঞ্জুরকে দেশের আইনী আদালত কিংবা কোর্ট মার্শালে হাজির না করে তড়িঘড়ি করে খুন করা হল কেন? তাঁর মৃতদেহ গোপনে কোথায় সরানো হল? ইত্যাদি বহু জাজ্বল্যমান প্রশ্নের জবাব জাতি এখনো পায়নি?

    মঞ্জুরকে খুন করার পর রেডিও টেলিভিশনে প্রচার করা হল মঞ্জুর হাটহাজারী থানা থেকে সেনাসদরে আনার পথে বিদ্রোহ করলে উভয়পক্ষের গুলাগুলিতে নিহত হয়। এ মিথ্যাচারের জনক কে? জি হত্যার বিচারের নামে গোপন সেনা ট্রায়াল বসিয়ে তড়িঘড়ি করে আরো তেরজন মুক্তিযুদ্ধা সেনাঅফিসারকে ফাঁসি দেয়া হল কার হুকুমে? জেনারেল মঞ্জুর হত্যা মামলার ২২জন সাক্ষীর সাক্ষী প্রমান বিশ্লেষন করে দেখা যায় জিয়া , মঞ্জুরের হত্যাকান্ডের মুল নায়ক তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল এরশাদ ! প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের খলনায়ক।

    ২০১৪ সালে মঞ্জুর হত্যা মামলার কিছু গুরুত্বপুর্ণ নথি ফাঁস হয়েছিল যা দেশের দুটি জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। এসব নথিতে ১ জুন ১৯৮১ রাতে চট্টগ্রাম সেনানিবাসে মঞ্জুরের জীবনের শেষ মুহূর্তের কিছু ঘটনার উল্লেখ রয়েছে। নথিগুলোর ভাষ্যমতে, মঞ্জুরকে সেনা হেফাজতে হত্যা করা হয়েছিল।সে নথিগুলোর মধ্যে আটজন সাধারণ সৈনিকের সাক্ষ্য ছিল এবং তার মধ্যে ওই পাঁচজন সৈনিকের সাক্ষ্যও ছিল যাঁরা মঞ্জুর হত্যার চাক্ষুষ বর্ণনা দিয়েছেন। এ সাক্ষ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, এ পাঁচ সৈনিক যৌথভাবে মঞ্জুর হত্যাকাণ্ডে একদল ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তার জড়িত থাকার অভিযোগ করেছেন। উপরন্তু তাঁরা এ অভিযোগও করেছেন যে ঊর্ধ্বতন এই সেনা কর্মকর্তারা একটি ‘গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব’-এর অংশ হিসেবে পরিচিত ‘ওপরের নির্দেশ’ অনুসরণ করছিলেন। এই ‘ওপরের নির্দেশ’-দাতাদের মধ্যে একদল জ্যেষ্ঠ সেনা কর্মকর্তা অন্তর্ভুক্ত ছিলেন, নায়েক ও সুবেদাররা বাংলাদেশ পুলিশের সিআইডির কাছে সাক্ষ্য দেওয়ার সময় তাঁদের নাম বলেছেন।

    এই সৈনিকদের ভাষ্যমতে, এই ‘গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব’ দুটো অংশে বিভক্ত। সামরিক ইউনিটের ওপর নির্দেশ ছিল, বেসামরিক নিরাপত্তা-বলয় থেকে মঞ্জুরকে বের করে আনা। ১ জুন ১৯৮১ মঞ্জুর সপরিবারে পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেন। তাঁকে রাখা হয় চট্টগ্রাম শহরের বাইরে, হাটহাজারী থানায়। মঞ্জুর পুলিশকে অনুরোধ করেছিলেন, তাঁর ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তার জন্য তাঁকে যেন সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া না হয়। সে সময় পুলিশের আইজিপি এ বি এম জি কিবরিয়ার নির্দেশে হাটহাজারী থানার পুলিশ অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাত্তারের সুনির্দিষ্ট নির্দেশ ছাড়া তাঁকে সেনা হেফাজতে পাঠাতে অস্বীকৃতি জানায়। এয়ার ভাইস মার্শাল সদরউদ্দীন ও আইজিপি এ বি এম জি কিবরিয়া উভয়েই ঢাকায় অনুষ্ঠিত এক উত্তপ্ত বৈঠকে রাষ্ট্রপতি সাত্তারকে অনুরোধ করেন, মঞ্জুরকে যেন সেনা হেফাজতে তুলে দেওয়া না হয়। এই দুই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার পৃথক জবানবন্দি থেকে দেখা যায়, তাঁরা উভয়েই আশঙ্কা করছিলেন যে মঞ্জুরকে সেনা হেফাজতে দেওয়া হলে তাঁর জীবন হুমকির মুখে পড়বে। ওই বৈঠকের সময় চট্টগ্রাম সেনানিবাস থেকে সেনাবাহিনীর একটি ইউনিট হাটহাজারী থেকে মঞ্জুরকে তাদের হেফাজতে নেওয়ার জন্য পথে বেরিয়ে এসেছে। বঙ্গভবনে বৈঠক চলাকালে সেনাবাহিনীর ইউনিটটি হাটহাজারী থানায় একতরফাভাবে প্রবেশ করে এবং মঞ্জুরকে তাঁদের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য দাবি জানায়। পুলিশ ও সেনাবাহিনীর মধ্যে এ সময় উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়। পুলিশ সেনাবাহিনীর উগ্রতাকে প্রতিহত করার চেষ্টা করছিল। অন্যদিকে নিরাপত্তার স্বার্থে মঞ্জুরকে কেন বেসামরিক কর্তৃপক্ষের অধীনে রাখা উচিত, তা নিয়ে পুলিশের সর্বোচ্চ কর্মকর্তা আইজিপি কিবরিয়া তখন সেনাপ্রধান জেনারেল এইচ এম এরশাদের সঙ্গে তর্ক করছিলেন।

    মঞ্জুরকে যাঁরা হাটহাজারী থানা থেকে তুলে আনতে গিয়েছিলেন, এই পাঁচ সৈনিক ছিলেন সেই সেনা ইউনিটের সদস্য। তাঁদের সাক্ষ্য অনুযায়ী, এয়ার ভাইস মার্শাল সদরউদ্দীন ও আইজিপি কিবরিয়ার এ আশঙ্কা মোটেও অমূলক ছিল না।এই সৈনিকেরা ১৯৯৫ সালে পুলিশের সিআইডি বিভাগের কাছে দেওয়া জবানবন্দিতে বলেছেন, সেনানিবাস থেকে হাটহাজারী থানার উদ্দেশে বের হওয়ার সময় ঊর্ধ্বতন এক সামরিক কর্মকর্তা তাঁদের বলেন, মঞ্জুর তাঁদের হেফাজতে আসামাত্র কোনো ‘সুবিধামতো জায়গা’য় তাঁকে ‘শেষ’ করতে হবে। সংক্ষেপে, এই সৈনিকেরা হাটহাজারীর দিকে যাত্রা শুরু করার সময় তাঁদের বলা হয়, এই ‘গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব’-এর উদ্দেশ্য: জেনারেল মঞ্জুরের হত্যাকাণ্ড সম্পন্ন করা।কমান্ডিং অফিসার মেজর এমদাদ সৈন্যদের বলেছিলেন, এই নির্দেশ সেনাবাহিনীর ‘উপর’ থেকে এসেছে। তাঁদের ভাষ্যমতে, তাঁরা সেনানিবাস থেকে হাটহাজারীর দিকে রওনা হওয়ার আগেই তাঁদের লক্ষ্য সম্পর্কে জানতে পেরেছিলেন।এই বিশেষ ইউনিট যখন রওনা দেয়, তখন বিচারপতি সাত্তারের দপ্তরে সদরউদ্দীন ও কিবরিয়ার সঙ্গে এরশাদের তীব্র বিতর্ক চলছে। মঞ্জুরকে সেনা হেফাজতে নেওয়ার জন্য এরশাদ ক্রমাগত চাপ দিচ্ছিলেন। তাঁরা উভয়েই এর বিরোধিতা করেন।

    চট্টগ্রামে বেসামরিক ও পুলিশ কর্তারা সে সময় অন্ধকারে হাতড়ে বেড়াচ্ছেন, ঢাকা থেকে কেন কোনো সুস্পষ্ট নির্দেশ আসছে না। ঢাকায় যে তাঁদের কর্মকর্তারা মঞ্জুরের জীবনরক্ষার জন্য রীতিমতো যুদ্ধ করছেন, সে কথা তাঁরা জানতেন না। এক সেনা সূত্রমতে, মঞ্জুর তাঁর এক সহকর্মীকে বলেছিলেন, এরশাদ তাঁকে ‘মেরে ফেলা’র পরিকল্পনা করেছে। আর এ কারণেই তাঁকে যেন পুলিশের হাত থেকে সেনা হেফাজতে পাঠানো না হয়।বেসামরিক কর্তৃপক্ষ ঢাকায় তাঁদের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে এক বিকল্প প্রস্তাব দিল। তাঁদের প্রস্তাব ছিল, মঞ্জুর ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের বিমান বাংলাদেশের একটি বিমানে ঢাকায় নেওয়া হোক। বেসামরিক পুলিশ মঞ্জুরের নিরাপত্তা বিধান করবে, আর সেনাবাহিনী নির্দিষ্ট দূরত্বে থাকবে।

    মঞ্জুরের নিজের জীবনের হুমকি থেকে তাঁকে রক্ষা করা আর কখনোই সম্ভব হয়নি। সেনাবাহিনীর ভেতরে মঞ্জুরের শত্রুরা কোনোভাবেই চায়নি যে তিনি জীবিত থাকুন। তবু এই আশাটুকু ছিল যে সেই দ্বিধান্বিত ও ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সময়ের ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে তিনি তাঁর ভাষ্য উপস্থাপন করবেন। ১ জুন ১৯৮১-তে এ রকম এক সন্ধিক্ষণে সবকিছু নির্ভর করছিল অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাত্তারের সিদ্ধান্তের ওপর। কিন্তু এয়ার ভাইস মার্শাল সদরউদ্দীন ও আইজিপি কিবরিয়া মঞ্জুরের নিরাপত্তা নিয়ে যে শঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন, সাত্তার তাতে কর্ণপাত না করে কথা রাখেন জেনারেল এরশাদের। এভাবে ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত—যেভাবেই হোক না কেন, সাত্তার মঞ্জুরের বিধিলিপি নির্ধারণ করে দেন। এয়ার ভাইস মার্শাল সদরউদ্দীন তাঁর স্বীকারোক্তিতে বলেছেন, তিনি সাত্তারকে অনুরোধ করে বলেছিলেন, ‘স্যার, দয়া করে নিশ্চিত করুন যাতে মঞ্জুরের কিছু না হয় আর তিনি ন্যায্য বিচার পান। মঞ্জুরের কিছু হলে জাতির কাছে আপনাকে জবাব দিতে হবে।’ সাত্তার এয়ার ভাইস মার্শাল সদরউদ্দীনকে নিশ্চয়তা দিয়ে বলেছিলেন, মঞ্জুরের বিচার করা হবে। সাত্তারের এমন সরল, কিংবা হয়তো একেবারেই অসরল নিশ্চয়তা সত্ত্বেও সেই রাতে মঞ্জুর সেনা হেফাজতে খুন হন। সদরউদ্দীন ও কিবরিয়া এ আশঙ্কাটিই করেছিলেন। আর ঘটলও ঠিক তা-ই।

    জেনারেল মঞ্জুর কখনোই আদালতে দাঁড়িয়ে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার সুযোগটি পেতেন না।কিংবা জেনারেল এরশাদ ও তাঁর সহযোগীরা তাঁর বিরুদ্ধে যে অভিযোগ দায়ের করার চেষ্টা করছিলেন, তা থেকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগও তাঁর মিলত না। সেনাবাহিনীর অ্যাডজুট্যান্ট জেনারেল মেজর জেনারেল মইনুল হোসেন চৌধুরী ও জেনারেল মীর শওকত আলীর সঙ্গে ১৯৮১ সালের ৩০ মে থেকে ১ জুনের মধ্যে মঞ্জুরের বার কয়েক ফোনালাপ হয়। সেসব ফোনালাপেও তিনি একই আশঙ্কার কথা প্রকাশ করেছিলে।উল্লেখিত নথি অনুযায়ী এই সৈনিকেরা চট্টগ্রাম সেনানিবাসের ভেতরে চোখের সামনে মঞ্জুরকে হত্যার শিকার হতে দেখেছেন। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নির্দেশে যে সৈনিকটি মঞ্জুরকে গুলি করেন, সাক্ষ্য অনুযায়ী তাঁকেও তাঁরা চিহ্নিত করেছেন।চট্টগ্রামের মেট্রোপলিটন পুলিশের তৎকালীন ডেপুটি কমিশনার আলী মোহাম্মদ ইকবালের সাক্ষ্যও এ নথিগুলোর মধ্যে আছে।এসব নথি মুলত মঞ্জুর হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা তৎকালীন এটর্ণি জেনারেল আমিনুল হক ও আব্দুল কাহার আকন্দের নেতৃত্বাধীন সিআইডির তদন্তকারী কর্মকর্তারা ১৯৯৫ সালে যেসব সাক্ষ্যের অডিও ধারণ করেছিলেন এবং পরে সেগুলোর লিখিত রূপ তৈরি করেছিলেন, সেখান থেকে এই সাক্ষ্যগুলো নেওয়া হয়েছে।

    ১৯৮১ সালে যে ১৩ জন মুক্তিযোদ্ধাকে জেনারেল জিয়ার হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার দায়ে নির্যাতন ও সংক্ষিপ্ত বিচারে ‘অতি দ্রুত’ কোর্ট মার্শাল করে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়, সেই বিচারে বিবাদী পক্ষের আইনজীবি হিসেবে আমিনুল হক এই মুক্তিযোদ্ধাদের রক্ষা করার চেষ্টা করেছিলেন। এই মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল যে তাঁরা মঞ্জুরের সঙ্গে চক্রান্ত করে জিয়াকে খুন করেছেন, তবে সে অভিযোগ কখনো প্রমাণ করা যায়নি। এই ১৩ অফিসারের বিচারে প্রধান ‘সাক্ষ্য’ ছিল তাঁদের কাছ থেকে নির্যাতনের মাধ্যমে আদায় করা স্বীকারোক্তি। আদালতে আনার পর তাঁরা সবাই স্বীকারোক্তিগুলো অস্বীকার করেছেন এবং এ অভিযোগ করেছেন যে তাঁদের নির্যাতন করা হয়েছে। কেউ কেউ গায়ের জামা খুলে শরীরের বিভিন্ন স্থানের জখম দেখিয়েছেন। এই সামরিক কর্মকর্তা ও বেসামরিক আইনজীবীরা প্রকাশ্যেই বলেছেন, তাঁদের আত্মপক্ষ সমর্থনে যথেষ্ট সুযোগ দেওয়া হয়নি।

    এরশাদের পতনের পর জেনারেল মঞ্জুরের বড় ভাই আবুল মনসুর আহমেদ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৫ এরশাদের বিরুদ্ধে মামলা করেন। এর পরপরই সিআইডি সম্ভাব্য সাক্ষীদের সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু করে। তাঁদের মধ্যে এয়ার ভাইস মার্শাল সদরউদ্দীন ও আইজিপি এ বি এম জি কিবরিয়াও ছিলেন।আমিনুল হকের মত একজন নিবেদিতপ্রাণ অ্যাটর্নি জেনারেলের তত্ত্বাবধানেই জেনারেল মঞ্জুর হত্যাকাণ্ডের তদন্তে বিশেষ অগ্রগতি হয়। ১৯৯৫ সালের জুন মাসে পুলিশের সিআইডির সহকারী সুপার আবদুল কাহার আকন্দ জেনারেল এরশাদ ও চারজন সামরিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগপত্র দাখিল করেছিলেন।এটিই ‘মঞ্জুর হত্যা মামলা’ নামে পরিচিত।

    বর্তমান মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সরকার দেশের সকল ক্রনিক অপরাধের বিচার করছেন। বঙ্গবন্ধু,জাতীয় চারনেতাসহ সকল হত্যাকান্ডের রহস্য জনসম্মুখে উম্মোচন করে চলেছেন। যুদ্ধাপরাধীসহ দেশের সকল খলনায়কদের বিচার করে চলেছেন। কিন্তু জেনারেল আবুল মঞ্জুর হত্যার বিচারের রায় এখনো আমরা পাইনি। আমি বিশ্বাস করি এ হত্যাকান্ডের রহস্য উম্মোচিত হলে সেনা বাহিনী এবং দেশের আপামর জনসাধারন পাকিস্তানী আইএসআই ও স্বাধীনতা- বিদ্বেষীদের অনেক ন্যাক্কারজনক দেশদ্রোহমুলক ষড়যন্ত্রের মুলোৎপাটন করতে সক্ষম হবে। আমি দেশপ্রেমিক সরকারের কাছে জোর দাবী জানাচ্ছি, দেশ এবং জাতির স্বার্থে জেনারেল আবুল মঞ্জুর হত্যার ন্যায্য বিচার করা হোক এবং ইতিহাসকে কলংকমুক্ত করা হোক।।

    মন্তব্য

    <img class=”alignnone size-full wp-image-29676″ src=”https://bdsangbadpratidin.com/wp-content/uploads/2024/05/IMG_20240503_224849-2.jpg” alt=”” width=”100%” height=”auto” />

    আরও পড়ুন

    You cannot copy content of this page